নিউজিল্যান্ডের গুহায় ১০ লাখ বছরের প্রাচীন ফসিল: উড়তে পারত কাকাপোর পূর্বপুরুষ
নিউজিল্যান্ডের নর্থ আইল্যান্ডের ওয়াইটোমো অঞ্চলটি তার জোনাকি পোকার আলোকিত গুহাগুলোর জন্য বিশ্বব্যাপী বিখ্যাত। কিন্তু এই অঞ্চলের মোয়া এগশেল কেভ নামে একটি গুহায় বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি এক প্রাগৈতিহাসিক গুপ্তধন আবিষ্কার করেছেন, যা সোনাদানা নয়, বরং হারিয়ে যাওয়া পৃথিবীর জীবাশ্ম। এই আবিষ্কার নিউজিল্যান্ডের প্রাকৃতিক ইতিহাসের এক অজানা অধ্যায় উন্মোচন করেছে।
গুহার গভীরে প্রাচীন জীবনের সন্ধান
গবেষক দলটি গুহার গভীর থেকে ১২ প্রজাতির প্রাচীন পাখি ও ৪ প্রজাতির ব্যাঙের ফসিল উদ্ধার করেছেন। সবচেয়ে চমকপ্রদ আবিষ্কার হলো তোতাপাখির একটি সম্পূর্ণ নতুন প্রজাতি, যার নাম দেওয়া হয়েছে স্ট্রিগপস ইনসুলাবোরিয়ালিস। বর্তমানে নিউজিল্যান্ডে কাকাপো নামে একধরনের তোতাপাখি আছে, যারা উড়তে পারে না এবং মাটিতে বসবাস করে। নতুন ফসিলটি এই কাকাপোরই এক অতি প্রাচীন আত্মীয়, তবে পার্থক্য হলো এটি সম্ভবত আকাশে উড়তে পারত। ফসিল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রাচীন পাখিটির পা বর্তমানের কাকাপোর মতো শক্তিশালী ছিল না, যা নির্দেশ করে তারা ডাঙার চেয়ে আকাশেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করত।
শুধু তোতাপাখিই নয়, সেখানে পাওয়া গেছে বিলুপ্ত একধরনের পায়রার ফসিল, যা অস্ট্রেলিয়ার ব্রোঞ্জউইং পায়রার সঙ্গে মিল রাখে। এছাড়াও আধুনিক তাকাহে পাখির এক বিলুপ্ত পূর্বপুরুষের খোঁজ মিলেছে।
আগ্নেয়গিরির ছাইয়ে ফসিলের বয়স নির্ধারণ
এই ফসিলগুলো যে ঠিক ১০ লাখ বছর আগের, তা বিজ্ঞানীরা বুঝতে পেরেছেন আগ্নেয়গিরির ছাইয়ের স্তর পরীক্ষা করে। নিউজিল্যান্ড একটি আগ্নেয়গিরিপূর্ণ দেশ, এবং গুহার মাটির স্তরগুলোতে ফসিলগুলো আগ্নেয়গিরির ছাইয়ের দুটি নির্দিষ্ট স্তরের মাঝখানে চাপা পড়ে ছিল। নিচের ছাইয়ের স্তরটি ১৫ লাখ ৫০ হাজার বছর আগের অগ্ন্যুৎপাতে তৈরি হয়েছিল, আর ওপরের স্তরটি ১০ লাখ বছর আগে। এর মানে, এই দুই সময়ের মাঝামাঝি কোনো এক সময়ে এই প্রাণীগুলো জীবিত ছিল।
কান্টারবুরি মিউজিয়ামের সিনিয়র কিউরেটর ও গবেষণার সহ-লেখক পল স্কোফিল্ড বলেন, ‘এটা নিউজিল্যান্ডের প্রাচীন ইতিহাসের কোনো হারিয়ে যাওয়া অধ্যায় নয়, বরং এটা আস্ত একটা হারিয়ে যাওয়া খণ্ড!’ এই আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের কাছে তেমন তথ্য না থাকা একটি বিশাল শূন্যস্থান পূরণ করেছে।
মানুষের আগমনের পূর্বেই প্রজাতি বিলুপ্তি
সাধারণ ধারণা হলো, নিউজিল্যান্ডের অদ্ভুত পাখি বিলুপ্ত হওয়ার পেছনে মানুষের হাত প্রধান ভূমিকা পালন করেছে, যারা সেখানে মাত্র ৭৫০ বছর আগে পৌঁছেছিল। কিন্তু এই গবেষণা সেই ধারণা বদলে দিচ্ছে। ফসিল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মানুষ সেখানে পা রাখার বহু আগেই, গত ১০ লাখ বছরে সেখানকার জীববৈচিত্র্যে বিশাল ধস নেমেছিল। মানুষের কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়াই প্রায় ৩৩ থেকে ৫০ শতাংশ প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল।
বিজ্ঞানীরা এর কারণ হিসেবে প্রকৃতির দিকেই আঙুল তুলছেন। সুপার-ভলকানো বা বিশাল আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত এবং জলবায়ুর দ্রুত পরিবর্তন এই বিলুপ্তির জন্য দায়ী। ফ্লিন্ডার্স ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ও প্রধান গবেষক ট্রেভর ওয়ার্থি বলেন, ‘এই গবেষণা প্রমাণ করে, সুপার-ভলকানো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো প্রাকৃতিক শক্তিগুলো ১০ লাখ বছর আগেই আমাদের বন্য প্রাণীদের ভাগ্য লিখে দিচ্ছিল।’
নিউজিল্যান্ডের প্রাণিজগৎ কেন এত অদ্ভুত ও আলাদা, তার উত্তর এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও ভাঙা-গড়ার ইতিহাসের মধ্যেই লুকিয়ে আছে। বাস্তুতন্ত্র বারবার ভেঙেছে এবং নতুন করে গড়ে উঠেছে, আর এই ভাঙা-গড়ার সাক্ষী হয়ে আজ ১০ লাখ বছর পর আমাদের সামনে এসেছে মোয়া এগশেল কেভের এই আবিষ্কার। এই গবেষণা প্যালিওনটোলজি বিষয়ক জার্নাল অ্যালকেরিঙ্গা: অ্যান অস্ট্রালশিয়ান জার্নাল অব প্যালিওনটোলজি-তে প্রকাশিত হয়েছে।
