মৌলভীবাজারে বসন্তের আগুন: ভুজবল গ্রামের গোঁসাই বাড়িতে পলাশ ফুলের রঙিন সমারোহ
মৌলভীবাজারে বসন্তের আগুন: পলাশ ফুলে রঙিন গোঁসাই বাড়ি

মৌলভীবাজারে বসন্তের আগুন: ভুজবল গ্রামের গোঁসাই বাড়িতে পলাশ ফুলের রঙিন সমারোহ

বসন্ত এসে গেছে মৌলভীবাজারের গ্রামে-গঞ্জে। ধান কাটার মৌসুম শেষ হয়েছে অনেক আগেই। পথের পাশের খড়ের মাঠে এখন ছেলেরা দল বেঁধে ফুটবল খেলছে। খাইঞ্জার হাওরে বোরো ধানের চাষে ব্যস্ত কৃষকরা। মাঠের ওপরে চিল পাখিরা একা কিংবা দল বেঁধে উড়ছে। এমনই এক বিকেলে হাওরপারের গ্রামের একটি বাড়ির গাছপালার মাথায় স্তূপ হয়ে আছে আগুনের শিখার মতো একগুচ্ছ পলাশ ফুল। হাওয়ায় দুলছে সেই রঙিন আগুনের ঝলকানি।

গোঁসাই বাড়ির পলাশ ফুলের মেলা

মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়নের ভুজবল গ্রামের এই বাড়িটি স্থানীয়ভাবে ‘গোঁসাই বাড়ি’ নামে পরিচিত। বাড়ির পুকুরপাড়ের গাছেই এমন দৃশ্য দেখা গেছে। পলাশ ফুলের এই রূপ দেখলে ‘পিন্দারে পলাশের বন পালাব পালাব মন...’ গানের কথা স্বতঃস্ফূর্তভাবে মনে পড়ে যায়।

বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে খাইঞ্জার হাওর এলাকা দিয়ে যাওয়ার সময় দেখা যায়, রাস্তার পাশে কেউ বোরো ধানের চারা তুলছেন, কেউ চারা রোপণ করছেন, আবার কেউ খেতে পানি দেওয়ার ব্যবস্থা করছেন। স্থানীয় কৃষকরা জানান, পানির অভাবে কিছু পতিত মাঠে বোরো চাষ সম্ভব হয়নি। খেতের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে কোদালীছড়া, যার পাড়ে বুনো গাছের ডালে চিল পাখিরা বসে আছে।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অনন্য নিদর্শন

গোঁসাই বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে একটি নয়, ছোট-বড় অনেক পলাশ গাছ ছড়িয়ে আছে বাড়ির আনাচে-কানাচে। পুকুরপাড়ে, রাস্তার পাশে, ঝোপঝাড়ের ভেতর ছড়ানো-ছিটানো এই গাছগুলোর মধ্যে পাঁচ-ছয়টিতে পলাশ ফুল ফুটেছে।

  • গাছগুলোর বয়স ২০-৩০ বছর বা তারও বেশি।
  • পুকুরপাড়ের দুটি গাছে সবচেয়ে বেশি ফুল ফুটেছে।
  • গাছের মাথায় আগুন রঙের ঢেউ খেলছে, ফুল ঝরে পড়ছে নিচে।
  • গাছতলা রঙিন চাদরের মতো সাজানো হয়ে আছে।

ফুলের কাছে শালিক ও কাঠশালিক পাখিরা বেশি দেখা গেছে। তারা এক ডাল থেকে অন্য ডালে উড়ে বেড়াচ্ছে। বাড়ির লোকজনের ধারণা, গাছগুলো প্রাকৃতিকভাবেই গজিয়েছে। উত্তরাধিকারীদের কেউই বলতে পারছেন না, পলাশ গাছগুলো কে লাগিয়েছেন।

উদাল ফুলের সঙ্গে মিলন

ফুল ফোটা একটি পলাশগাছের পাশেই দুটি উদালগাছ দাঁড়িয়ে আছে। সোনালি রঙের উদাল ফুল ডালে ডালে ঝাঁক বেঁধে ফুটেছে, যা পলাশের লাল-কমলা রঙের সঙ্গে মিলে অপূর্ব দৃশ্য সৃষ্টি করেছে।

বাড়ির অংশীদার নারায়ণ গোস্বামী জানান, “কীভাবে এখানে পলাশ ফুলের গাছগুলো হয়েছে, আমার ধারণা নেই। প্রতিবছর এই সময়ে ফুল ফোটে। আলাদা করে গাছগুলোর পরিচর্যার কোনো প্রয়োজন পড়ে না।”

অপর অংশীদার ফণী বাগচি বলেন, “প্রায় ২০ বছর আগে একটি গাছ কেটে ঘরের কাজে লাগিয়েছিলাম। সেই গাছের গোড়া থেকে ডালপালা গজিয়ে এখন ওই গাছটিই অনেক বড় হয়ে গেছে।” তিনিও বলতে পারেননি, তাঁদের বাড়িতে এত পলাশগাছ থাকার কারণ।

ভবিষ্যতের ‘পলাশ বাড়ি’

গাছগুলো কেটে ফেলা না হলে ভবিষ্যতে এই বাড়িটি ‘পলাশ বাড়ি’ নামেই পরিচিত হয়ে উঠতে পারে। বসন্তে রঙের আগুন লাগবে তখন বাড়িটিতে। এসব ভাবতে ভাবতেই পশ্চিম আকাশে সূর্য ডুবতে শুরু করে। গোধূলির রঙে প্রকৃতি স্তব্ধ, নির্জন হয়ে যায়। সেই রঙের সঙ্গে মিশে যায় পলাশ ফুলের লালিমা। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা এসে পলাশ বাড়িটিকে রাতের আঁধার জড়িয়ে ধরে।

মৌলভীবাজারের ভুজবল গ্রামের এই গোঁসাই বাড়ি প্রকৃতির অপূর্ব দান পলাশ ফুলের মাধ্যমে বসন্তের আগুনে রাঙিয়ে তুলেছে, যা দর্শনার্থীদের মনে অমলিন স্মৃতি রেখে যায়।