বিশ্বজুড়ে বিমান জ্বালানির আকাশচুম্বী মূল্যের মধ্যেই গ্রিনহাউস গ্যাসকে জেট ফুয়েল জ্বালানিতে রূপান্তরের এক বৈপ্লবিক প্রযুক্তিতে বড় ধরনের অগ্রগতি অর্জন করেছেন চীনা বিজ্ঞানীরা। বুধবার (২৯ এপ্রিল) সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, সাংহাই অ্যাডভান্সড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষকরা ল্যাবরেটরির গণ্ডি পেরিয়ে এখন এই রূপান্তর প্রক্রিয়াকে বড় পরিসরে উৎপাদনের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন।
কার্বন ডাই-অক্সাইড থেকে জেট ফুয়েল
চীনা একাডেমি অব সায়েন্সের এই গবেষক দলটি মূলত কার্বন ডাই-অক্সাইডকে সরাসরি ‘লং-চেইন হাইড্রোকার্বনে’ পরিণত করতে সক্ষম হয়েছেন, যা জেট ফুয়েলের প্রধান উপাদান। এই প্রক্রিয়ায় বর্জ্য গ্যাসকে পানির সঙ্গে মিশ্রিত করে উচ্চ শক্তির তরল জ্বালানি তৈরি করা হয়, যা মূলত দহন প্রক্রিয়ার একটি বিপরীতমুখী পদ্ধতি। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই উদ্ভাবনটি বিমান শিল্পের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার চলমান যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় এবং অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় জেট ফুয়েলের দাম এখন রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।
জ্বালানি বাজারে অস্থিতিশীলতার মোকাবিলা
জ্বালানি বাজারের এই চরম অস্থিতিশীলতার সময়ে চীনা বিজ্ঞানীদের এই সাফল্য একদিকে যেমন জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাবে, অন্যদিকে কার্বন নিঃসরণকে পুনঃব্যবহারযোগ্য করার মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষায় বড় ভূমিকা রাখবে। আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটির মর্যাদাপূর্ণ জার্নাল ‘এসিএস ক্যাটালাইসিস’-এ প্রকাশিত গবেষণাপত্র অনুযায়ী, চীনা দলটি দীর্ঘদিনের প্রযুক্তিগত প্রতিবন্ধকতাগুলো কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘ সময় ধরে কার্বন চেইন বা শিকল দক্ষতার সঙ্গে বৃদ্ধি করা এবং বড় পরিসরে বিমান জ্বালানির জন্য প্রয়োজনীয় লম্বা অণুগুলো তৈরি করার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে আসছিলেন।
পরিবেশ ও অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব
নতুন এই পদ্ধতিতে কার্বন নিঃসরণকে রিসাইকেল বা পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করে জ্বালানি তৈরি করা সম্ভব হওয়ায় এটি বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতির চিত্র বদলে দিতে পারে। যদি এই প্রযুক্তিটি সফলভাবে বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করা যায়, তবে এটি কেবল বিমান খাতের খরচই কমাবে না, বরং গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রভাব কমিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন রোধেও কার্যকর অবদান রাখবে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চীনের এই সাফল্য ভবিষ্যতে অন্যান্য দেশকে বিকল্প জ্বালানি গবেষণায় আরও অনুপ্রাণিত করবে। সাংহাইয়ের এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি এখন প্রযুক্তিটির বৃহৎ আকারের উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো উন্নয়নের দিকে মনোনিবেশ করছে। বিমান শিল্প যখন ক্রমবর্ধমান জ্বালানি খরচের চাপে পিষ্ট, তখন এই ‘কার্বন-টু-জেট ফুয়েল’ প্রযুক্তিটি একটি সম্ভাব্য লাইফলাইন বা জীবন রক্ষাকারী পথ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
সময়োপযোগী উদ্ভাবন
জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এই ধরনের উদ্ভাবন অত্যন্ত সময়োপযোগী বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই প্রযুক্তির সফল প্রয়োগ শুরু হলে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়ার পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী পরিবেশ দূষণ রোধেও এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন হবে। সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি



