বাংলাদেশে অর্থপাচারের আলোচনা উঠলেই একটি নাম বারবার সামনে আসে— সুইস ব্যাংক। রাজনৈতিক বিতর্ক, সংসদীয় আলোচনা, দুর্নীতির অভিযোগ কিংবা বিদেশে পাচার হওয়া অর্থের প্রসঙ্গ— সব ক্ষেত্রেই যেন সুইস ব্যাংক একটি প্রতীকী নাম হয়ে উঠেছে। প্রতি বছর সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক (এসএনবি) বিদেশিদের আমানতের তথ্য প্রকাশ করলে বাংলাদেশেও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। প্রশ্ন ওঠে— কারা এই অর্থ জমা রেখেছেন, টাকা কীভাবে গেলো, আর সেই অর্থ কখনও দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে কিনা।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের আমানত ৪১ শতাংশ বেড়ে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁতে পৌঁছেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ১২ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকা। এই তথ্য প্রকাশের পর আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে সুইস ব্যাংক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সুইস ব্যাংকে অর্থ রাখা নিয়ে এত আলোচনা কেন?
আলোচনার শুরু যেভাবে
বাংলাদেশে সুইস ব্যাংক নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা শুরু হয় ২০১৪ সালে। সে সময় সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানতের পরিমাণ হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার তথ্য প্রকাশিত হলে— বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত আলোচনায় আসে।
তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ঘোষণা দিয়েছিল, সুইস ব্যাংকে কারা অর্থ জমা রেখেছেন তা খুঁজে বের করা হবে এবং পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। জাতীয় সংসদে জানানো হয়েছিল, সুইজারল্যান্ড সরকারের কাছে আমানতকারীদের তথ্য চেয়ে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পাঠানো হবে।
কিন্তু একযুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের কোনও নির্দিষ্ট তালিকা প্রকাশ করা যায়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকও কখনও আনুষ্ঠানিকভাবে বলতে পারেনি যে, অমুক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার করে সুইস ব্যাংকে জমা রেখেছে।
সুইস ব্যাংক আসলে কী?
অনেকের ধারণা, সুইস ব্যাংক বুঝি একটি নির্দিষ্ট ব্যাংকের নাম। বাস্তবে তা নয়। ‘সুইস ব্যাংক’ বলতে মূলত সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে বোঝানো হয়। দেশটিতে শতাধিক বাণিজ্যিক, বিনিয়োগ ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের ব্যাংকিং ও বিনিয়োগসেবা প্রদান করে।
দীর্ঘদিন ধরে কঠোর গোপনীয়তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, শক্তিশালী আইনি সুরক্ষা এবং নিরাপদ আর্থিক পরিবেশের কারণে সুইজারল্যান্ড বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় সম্পদ সংরক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
কেন সুইস ব্যাংকের প্রতি এত আকর্ষণ?
সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকিং খাত বিশ্বজুড়ে পরিচিত কয়েকটি কারণে। প্রথমত, দেশটির ব্যাংকিং গোপনীয়তা আইন বহু বছর ধরে বিশ্বের ধনী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে আকর্ষণীয় ছিল। দ্বিতীয়ত, সুইজারল্যান্ড রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ এবং অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্থিতিশীল একটি দেশ। তৃতীয়ত, সুইস ফ্রাঁকে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ও স্থিতিশীল মুদ্রা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। চতুর্থত, বড় সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ পরিচালনার ক্ষেত্রে সুইস ব্যাংকগুলোর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। এসব কারণে বিশ্বের ধনী ব্যক্তি, বহুজাতিক কোম্পানি, বিনিয়োগ তহবিল এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীরা সুইস ব্যাংক ব্যবহার করেন।
সুইস ব্যাংকে টাকা রাখা কি অবৈধ?
এখানেই সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা রয়েছে। সুইস ব্যাংকে অর্থ রাখা মানেই যে তা অবৈধ বা পাচার করা অর্থ— এমন ধারণা সঠিক নয়। বিশ্বের লাখ লাখ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান বৈধভাবে সেখানে অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সুইস ব্যাংকে থাকা সব অর্থ যে পাচার করা, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। কারণ, বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশি নাগরিক, আন্তর্জাতিক ব্যবসায় জড়িত ব্যক্তি বা বিদেশে নিবন্ধিত বাংলাদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানও সেখানে অর্থ জমা রাখতে পারে।
তবে বাংলাদেশের আইনে দেশ থেকে অর্থ বিদেশে নিয়ে গিয়ে ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে জমা রাখার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। এ কারণে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থের পরিমাণ বেড়ে গেলে স্বাভাবিকভাবেই অর্থপাচারের প্রশ্ন সামনে আসে।
গোপনীয়তার রহস্য কতটা সত্য?
একসময় সুইস ব্যাংক মানেই ছিল গোপন অর্থের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। কিন্তু গত এক দশকে পরিস্থিতি অনেক বদলে গেছে। বর্তমানে সুইজারল্যান্ড আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময় ব্যবস্থার আওতায় এসেছে। কর ফাঁকি, মানি লন্ডারিং এবং অবৈধ অর্থ লেনদেন ঠেকাতে দেশটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তিতে যুক্ত হয়েছে। ফলে আগের মতো সম্পূর্ণ গোপনীয়তা এখন আর নেই। অনেক দেশের কর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তথ্য বিনিময় করা হয় এবং সন্দেহজনক লেনদেনের ওপর কঠোর নজরদারি চালানো হয়।
অর্থাৎ ‘সুইস ব্যাংকে টাকা রাখলে কেউ জানতে পারবে না’—এই ধারণা এখন আর পুরোপুরি সত্য নয়।
তাহলে কারা কত টাকা রেখেছে, তা জানা যায় কীভাবে?
প্রতি বছর সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক বিভিন্ন দেশের নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের মোট আমানতের পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। এই প্রতিবেদনে দেশভিত্তিক মোট অর্থের পরিমাণ উল্লেখ থাকে। তবে কোনও ব্যক্তির নাম, প্রতিষ্ঠানের পরিচয় কিংবা নির্দিষ্ট অ্যাকাউন্টের তথ্য প্রকাশ করা হয় না।
ফলে জানা যায়, বাংলাদেশের নাগরিক বা প্রতিষ্ঠানের মোট কত অর্থ সুইস ব্যাংকিং ব্যবস্থায় রয়েছে, কিন্তু কারা সেই অর্থের মালিক তা জানা যায় না। এ কারণেই প্রতিবছর নতুন করে আলোচনা শুরু হয় এবং নানা ধরনের জল্পনা-কল্পনার জন্ম হয়।
কেন অর্থ ফেরত আনা কঠিন?
বাংলাদেশে বহু বছর ধরে রাজনৈতিক দল, অর্থনীতিবিদ ও সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার দাবি জানানো হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে বিদেশ থেকে অর্থ ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জটিল একটি প্রক্রিয়া।
কোনও অর্থ ফেরত আনতে হলে প্রথমে প্রমাণ করতে হয় যে, ওই অর্থ অবৈধভাবে অর্জিত হয়েছে, অথবা আইন লঙ্ঘন করে বিদেশে নেওয়া হয়েছে। এরপর সংশ্লিষ্ট দেশের আদালত ও তদন্ত সংস্থার মাধ্যমে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়।
কেবল একটি দেশের আমানতের পরিমাণ বেড়েছে— এই তথ্যের ভিত্তিতে অর্থ ফেরত আনা সম্ভব নয়। এজন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তি, অর্থের উৎস এবং পাচারের পথ শনাক্ত করতে হয়।
তাহলে এত আলোচনা কেন?
সুইস ব্যাংক নিয়ে আলোচনার মূল কারণ তিনটি। প্রথমত, এটি অর্থপাচারের প্রতীক হিসেবে মানুষের মনে একটি শক্তিশালী ধারণা তৈরি করেছে। দ্বিতীয়ত, প্রতি বছর প্রকাশিত পরিসংখ্যান নতুন করে জনমনে কৌতূহল সৃষ্টি করে। তৃতীয়ত, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ, দুর্নীতি এবং কালোটাকার প্রশ্নে সুইস ব্যাংকের নাম রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আলোচনায় একটি প্রতীকী ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
বাস্তবতা কী বলছে?
বাস্তবতা হলো, সুইস ব্যাংক এখন আর আগের মতো রহস্যময় বা অভেদ্য কোনও অর্থভাণ্ডার নয়। এটি বিশ্বের অন্যতম নিয়ন্ত্রিত, প্রযুক্তিনির্ভর এবং আন্তর্জাতিকভাবে সংযুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা।
তবুও নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা, আর্থিক সুরক্ষা এবং বৈশ্বিক আস্থার কারণে বিশ্বের ধনী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে সুইজারল্যান্ড এখনও একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য।
বাংলাদেশে সুইস ব্যাংক নিয়ে আলোচনা যতটা আবেগনির্ভর, বাস্তবতা তার চেয়ে অনেক বেশি আইনি, অর্থনৈতিক এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতানির্ভর। ফলে সুইস ব্যাংকে জমা অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে, কিন্তু সেই অর্থের সবটুকু যে পাচার করা, কিংবা সব অর্থই যে অবৈধ— এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও সমানভাবে ভুল হবে।
সুইস ব্যাংক নিয়ে রহস্যের চেয়ে বাস্তবতা এখন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই বাস্তবতা হলো—অর্থপাচার রোধের জন্য শুধু সুইস ব্যাংকের দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না, বরং অর্থ বিদেশে যাওয়ার পথ বন্ধ করা, আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।



