স্বর্ণের দাম বেড়ে জাকাতের নিসাব দ্বিগুণ, এক বছরে বাড়লো ২০ হাজার টাকা
স্বর্ণের দাম বেড়ে জাকাতের নিসাব দ্বিগুণ, বাড়লো ২০ হাজার টাকা

স্বর্ণের দাম বেড়ে জাকাতের নিসাব দ্বিগুণ, এক বছরে বাড়লো ২০ হাজার টাকা

রমজান মাস শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দেশের সামর্থ্যবান মুসলিমরা জাকাত পরিশোধের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কিন্তু এ বছর জাকাত হিসাব-নিকাশে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বর্ণের মূল্যবৃদ্ধি জাকাতের ‘নিসাব’— অর্থাৎ জাকাত ফরজ হওয়ার ন্যূনতম সম্পদের সীমা এবং জাকাতের পরিমাণে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামের উল্লম্ফন

আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম গত রমজানের পর থেকে প্রতি ট্রয় আউন্স প্রায় ২,৯০০ ডলার থেকে বেড়ে ৫,১০০ ডলারের বেশি পৌঁছেছে। এই উল্লম্ফন দেশের বাজারেও সরাসরি প্রতিফলিত হয়েছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম ২ লাখ ৬১ হাজার ৪০ টাকা। ২০০০ সালে যেখানে এই দাম ছিল মাত্র ৬ হাজার ৯০০ টাকা, সেখানে ২০২৬ সালে তা প্রায় ৩ হাজার ৬০০ শতাংশ বেড়েছে।

জাকাতের নিসাব ও পরিমাণে পরিবর্তন

ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী, কারও কাছে সাড়ে সাত ভরি (প্রায় ৮৫–৮৭.৪৮ গ্রাম) বা তার বেশি স্বর্ণ এক বছর ধরে থাকলে তার ওপর জাকাত ফরজ হয়। ‘নিসাব’ পরিমাণ সম্পদে জাকাতের হার ধরা হয় ২.৫ শতাংশ। গত বছর ২০২৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি দেশে প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ছিল ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ঠিক একবছর পর, ২০২৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি দাম বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৬১ হাজার টাকায়। অর্থাৎ একবছরে ভরিপ্রতি দাম বেড়েছে ১ লাখ ১১ হাজার টাকা, যা প্রায় ৭৪ শতাংশ বৃদ্ধি।

সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণের উদাহরণ দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়। ২০২৫ সালে ৭.৫ ভরি স্বর্ণের মোট বাজারমূল্য ছিল ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকা, জাকাতের পরিমাণ দাঁড়াত ২৮ হাজার ১২৫ টাকা। কিন্তু ২০২৬ সালে একই পরিমাণ স্বর্ণের বাজারমূল্য বেড়ে ১৯ লাখ ৫৭ হাজার ৫০০ টাকা, ফলে জাকাতের পরিমাণ বেড়ে হয়েছে প্রায় ৪৮ হাজার ৯৩৮ টাকা। একবছরের ব্যবধানে দামের বৃদ্ধির কারণে জাকাত বেড়েছে প্রায় ২০ হাজার ৮১৩ টাকা।

নিসাবের সীমা দ্বিগুণ হওয়ার প্রভাব

এ বছর জাকাতের নিসাব নির্ধারিত হয়েছে ৮৫ গ্রাম স্বর্ণের সমমূল্যে, যা বর্তমান বাজারদরে প্রায় ১৫ হাজার ডলারের সমান। গত বছর এই সীমা ছিল প্রায় ৮ হাজার ডলার। অর্থাৎ, স্বর্ণের দাম বাড়ায় নিসাবের অঙ্ক প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ডলারের বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী, বাংলাদেশি মুদ্রায় এ বছর কারও কাছে প্রায় ১৮ লাখ ৩৪ হাজার টাকার বেশি নগদ অর্থ একবছর ধরে থাকলেই কেবল তার ওপর জাকাত প্রযোজ্য হবে।

অপরদিকে, গত বছর একই হিসাবে নিসাবের পরিমাণ ছিল প্রায় ৯ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। ফলে স্বর্ণের মূল্যবৃদ্ধির কারণে একবছরে জাকাতের নিসাব কার্যত দ্বিগুণ হয়েছে। নিসাবের সীমা বেড়ে যাওয়ায় কিছু মানুষ জাকাতের আওতার বাইরে চলে যেতে পারেন, তবে যাদের হাতে উল্লেখযোগ্য স্বর্ণ বা উচ্চমূল্যের সম্পদ আছে, তাদের প্রদেয় জাকাতের অঙ্ক বেড়ে যাবে।

জাকাতের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব

স্বর্ণের দামের উল্লম্ফন জাকাতের সামাজিক প্রভাবও বাড়াচ্ছে। এতে মোট জাকাত আদায় বৃদ্ধি পেতে পারে, যা দরিদ্রদের সহায়তার পাশাপাশি অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ায়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ বলেন, “দেশে বছরে প্রায় একলাখ কোটি টাকার জাকাত সংগ্রহের সম্ভাবনা রয়েছে। সুশৃঙ্খলভাবে আহরণ ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এটি দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।”

জাকাত দেওয়ার নিয়ম ও শর্তাবলী

ইসলামে জাকাত হলো ফরজ ইবাদত, যার অর্থ ‘পবিত্রতা’ বা ‘বৃদ্ধি’। প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমানের সম্পদ ‘নিসাব’ অতিক্রম করে পূর্ণ একচন্দ্র বছর তার মালিকানায় থাকলে মোট সম্পদের ২ দশমিক ৫ শতাংশ জাকাত দিতে হয়। জাকাত বাধ্যতামূলক হওয়ার জন্য পাঁচটি শর্ত আছে:

  1. নিসাব অর্থাৎ নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া।
  2. নিসাবের সম্পদ এক পূর্ণ চন্দ্রবছর ধরে থাকা।
  3. সম্পদে পরিপূর্ণ মালিকানা (ওনারশিপ) থাকা।
  4. অতিরিক্ত সম্পদ থাকা, অর্থাৎ নিত্যপ্রয়োজনের চেয়ে বেশি সম্পদ থাকা।
  5. ঋণগ্রস্ত না থাকা। যদি সম্পদের তুলনায় ঋণ বেশি থাকে, তবে জাকাত দেওয়ার আগে ঋণ পরিশোধ করতে হবে।

স্বর্ণ ও রূপার নিসাবের পার্থক্য

মাওলানা মিজানুর রহমান আজহারী বলেন, “বর্তমান সমাজে স্বর্ণের মূল্য অনেক বেশি, আর রূপার মূল্য কম। তাই স্বর্ণের নিসাব ধরলে অনেকের জন্য জাকাত ফরজ হয় না। অপরদিকে, রূপার নিসাব ধরলে বেশি মানুষ উপকৃত হবে। তাই আমি রূপার নিসাব গ্রহণ করার পরামর্শ দিই।” বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির তথ্য অনুযায়ী, দেশের বাজারে প্রতি গ্রাম রূপার দাম এখন ৫৭৫ টাকা ছাড়িয়েছে। এর ফলে ৫৯৫ গ্রাম রূপার বাজার মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩,৪২,১২৫ টাকা।

জাকাত দেওয়ার সময় ও পদ্ধতি

শায়খ আহমদুল্লাহ বলেন, “জাকাতের সময় নির্ধারিত হয় ব্যক্তির সম্পদের মালিকানা শুরু হওয়ার তারিখ অনুযায়ী। উদাহরণস্বরূপ, যদি কেউ জিলহজ মাসে নিসাবের মালিক হন, পরবর্তী বছরের জিলহজে তার জাকাত দেওয়া ওয়াজিব হবে। তবে সুবিধার্থে আগেভাগে দেওয়াও বৈধ। রমজান মাসে দেওয়া বেশি সওয়াবের জন্য উৎসাহজনক হলেও, জাকাত দেওয়ার মাস নির্দিষ্ট নয়।”

জাকাত কাদেরকে দেওয়া যাবে

অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত হকদারের প্রথম দুটি শ্রেণী হলো— ফকির ও মিসকিন। ফকির বলতে সেই ব্যক্তিকে বোঝানো হয়, যার আয় আছে, কিন্তু তা দিয়ে মৌলিক প্রয়োজন— খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা পূরণ হয় না। আর মিসকিন হলো সম্পূর্ণ নিঃস্ব ব্যক্তি, যার নিজের কোনও উপার্জন বা সম্পদ নেই। ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিকে জাকাত দেওয়া যাবে, তবে শর্ত হলো, ঋণটি হতে হবে মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে সৃষ্ট।

শায়খ আহমদুল্লাহর মতে, জাকাত দেওয়ার আগে প্রকৃত অবস্থা যাচাই করা জরুরি। তার ভাষায়, “জাকাত একটি আমানত। প্রকৃত হকদারের হাতে পৌঁছানো নিশ্চিত করাই আমাদের দায়িত্ব।”