নতুন গভর্নরের সামনে অর্থনীতি ও আর্থিক খাতের চ্যালেঞ্জ: সুদহার কমানো থেকে অবকাঠামো সংকট
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর একটি কঠিন সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করছেন। তার সামনে অর্থনীতি ও আর্থিক খাতের বহুমুখী চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যেগুলো মোকাবিলা করে স্থিতিশীলতা ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে দক্ষতা, পেশাদারি ও দৃঢ় সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। আমরা প্রত্যাশা করি, নতুন গভর্নর শুরু থেকেই সর্বোচ্চ পেশাদারি ও দৃঢ়তার সঙ্গে এই কাজটি এগিয়ে নেবেন।
ঋণের সুদহার কমানোর বাস্তবতা
নতুন গভর্নর ইতিমধ্যে ঋণের সুদ হার কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছেন। একজন ব্যাংকার হিসেবে আমরাও চাই, ঋণের সুদহার কমে আসুক। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বর্তমানে ব্যাংক খাতে সবচেয়ে বড় ঋণগ্রহীতা সরকার। সরকার যেখানে ১০ শতাংশ বা তার বেশি সুদে ট্রেজারি বিল-বন্ডের মাধ্যমে অর্থ ধার করছেন, সেখানে ব্যাংকগুলোর পক্ষে সুদহার কমিয়ে আনা অত্যন্ত কঠিন।
বর্তমানে কোনো কোনো ব্যাংক আমানত সংগ্রহে ১১ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিচ্ছে। এই সুদে টাকা ধার করে কীভাবে কম সুদে ঋণ দেওয়া সম্ভব? অনেকেই বলেন, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার একটি বড় বাধা। ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা এটি বেশি বলে থাকেন। আমরাও মানি, উচ্চ সুদহার বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একটি বাধা, তবে একমাত্র বা প্রধান বাধা এটি নয়।
অবকাঠামো সংকট: বিনিয়োগের মূল সমস্যা
একজন বিনিয়োগকারী যখন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন, সবার আগে তিনি গ্যাস-বিদ্যুৎ, বন্দরসহ অবকাঠামো সুবিধাগুলোকে বিবেচনায় নেন। ওই সব সুবিধা নিশ্চিত হওয়ার পর আসে টাকার প্রশ্ন। বর্তমানে দেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে গ্যাস-বিদ্যুৎসহ অবকাঠামো সংকটই বড় সমস্যা। বিদ্যমান ব্যবসায়ীরাও এসব সংকটের কারণে ব্যবসা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিতে পারছেন না। সেখানে নতুন বিনিয়োগকারীরা কীভাবে বিনিয়োগ করবেন, সেটি প্রশ্নসাপেক্ষ।
তাই বিনিয়োগ বাড়াতে হলে সবার আগে অবকাঠামো সমস্যার সমাধান করতে হবে। তারপর ঋণের সুদহার কমানোর বিষয়টি নিয়ে কাজ করা যেতে পারে।
রপ্তানি হ্রাস ও বৈদেশিক মুদ্রাবাজার
আমরা দেখছি যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ইস্যুকে কেন্দ্র করে রপ্তানির গতি কমে গেছে। এই অবস্থায় সেটিকে মোকাবিলা করে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে নতুন গভর্নরকে পদক্ষেপ নিতে হবে। আমরা আশা করি, নতুন গভর্নর ব্যাংক খাতের চলমান সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখবেন। নতুন সরকারের পক্ষ থেকে আমরা এরই মধ্যে সেই অঙ্গীকার শুনেছি।
শুরুতে সংস্কার বাস্তবায়নের কঠোর বার্তা দেওয়া না গেলে পুরোনো সবাই এই খাতটিকে আবারও আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবে। সেই চাপ গভর্নরকে শক্ত হাতে মোকাবিলা করতে হবে।
দক্ষতা ও পেশাদারি নিশ্চিতকরণ
সেই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ আর্থিক খাতে দক্ষতা ও পেশাদারি নিশ্চিত করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সংস্থা থেকে শুরু করে অনেক ক্ষেত্রে পেশাদারি আচরণের অভাব দেখতে পাচ্ছি। এটি আর্থিক খাতের জন্য মোটেই সুখকর নয়। তাতে বিদেশে দেশের ইমেজ ক্ষুণ্ন হয়। যেহেতু ব্যাংক খাতকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাজ করতে হয় তাই অপেশাদার যেকোনো আচরণের খেসারত আমাদের দিতে হয়। আমরা আশা করব নিয়ন্ত্রক সংস্থা থেকে শুরু করে ব্যাংক ও আর্থিক খাতে পেশাদারি নিশ্চিত করতে নতুন গভর্নর ব্যবস্থা নেবেন।
উচ্চ ঋণ খেলাপি ও মূল্যস্ফীতি
এ ছাড়া উচ্চ ঋণ খেলাপিও নতুন গভর্নরের জন্য বিরাট এক চ্যালেঞ্জ হয়ে সামনে রয়েছে। সেই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির বিষয়টিও মোকাবিলা করতে হবে তাঁকে। তাই আমরা নতুন গভর্নরের কাছে এসব বিষয়ে দৃঢ় পদক্ষেপ দেখতে চাই।
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক
