নতুন সরকারের কাছে অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন ও সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রত্যাশা
নতুন সরকারের কাছে অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনের প্রত্যাশা

নতুন সরকারের কাছে অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন ও সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রত্যাশা

গত প্রায় দেড় বছর ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি সুস্পষ্ট স্থবিরতা লক্ষ্য করা গেছে। এই সময়কালে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেয়েছে এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সংকোচন দেখা দিয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ বেকার অবস্থায় রয়েছেন। অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি সামাজিক ক্ষেত্রেও সহিংসতা ও নানা ধরনের অস্থিরতা বিদ্যমান ছিল। এই সমগ্র পরিস্থিতির ফলে দেশে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার অভাব তৈরি হয়েছে, যা বিনিয়োগ প্রবাহকে ব্যাহত করেছে।

তিনটি প্রধান প্রত্যাশা

নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত নতুন সরকারের কাছে জনগণের তিনটি প্রধান প্রত্যাশা রয়েছে। প্রথমত, অর্থনৈতিক স্থবিরতা কাটিয়ে উঠে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং মানুষের আয় বৃদ্ধি করা। দ্বিতীয়ত, বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নতি সাধন করা। তৃতীয়ত, বিদ্যমান সমস্যাগুলোকে ধীরে ধীরে হ্রাস করার মাধ্যমে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা।

নতুন সরকারের কাছে মানুষের প্রাথমিক প্রত্যাশা হলো, অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে অস্থিরতা ও স্থবিরতা বিরাজ করছে, সেখানে গতি ও স্থিতিশীলতা আনয়ন করা। জনগণ কেবল সামাজিক বা পারিবারিক জীবনে নয়, অর্থনৈতিক জীবনেও স্বস্তি ফিরে পাওয়ার আশা করছে।

বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে হলে বিনিয়োগ বৃদ্ধি অপরিহার্য। এজন্য মূল্যস্ফীতি ও সুদহার হ্রাস করে একটি অনুকূল বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে দেশীয় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা ফিরে আসবে এবং বিনিয়োগের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক প্রণোদনা প্রদানই যথেষ্ট নয়। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নীতির ধারাবাহিকতা কামনা করেন।

দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সমস্যা

দেশের অর্থনীতির কিছু দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা নিয়েও জনগণের উদ্বেগ রয়েছে। বাংলাদেশের ঋণের বোঝা অত্যন্ত বেশি এবং বর্তমানে রাজস্ব আয়ের তুলনায় রাজস্ব ব্যয় অনেক বেশি। জনগণ প্রত্যাশা করে যে সরকার এই অসমতা দূর করতে সরকারি খরচ কমানোর জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। নতুন সরকারকে সুষম উন্নয়নের উপর জোর দিতে হবে। সুষম উন্নয়নের দুটি দিক রয়েছে: বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সমতা প্রতিষ্ঠা এবং বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে সমতা সৃষ্টি করা।

দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বর্তমানে বাংলাদেশে তিন কোটির বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার উপরে বসবাস করছে। প্রায় ছয় কোটি মানুষ দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে রয়েছে। শুধুমাত্র আয়ের অসমতা নয়, সম্পদের অসমতা এবং সুযোগের অসমতাও বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে।

আঞ্চলিক বৈষম্য ও আর্থিক খাতের সংস্কার

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যেও বৈষম্য বিদ্যমান। দেশের উত্তরবঙ্গের সাথে দক্ষিণবঙ্গ বা ঢাকার আশপাশের অঞ্চলের তুলনা করলে দেখা যায়, বহু দিক থেকে তারা বঞ্চিত। এই সমস্যা সমাধানে সরকারকে অর্থ বণ্টনে সচেতন হতে হবে।

আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি। বিগত সময়ে আর্থিক খাতে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। প্রয়োজনীয়তা যাচাই না করেই একের পর এক ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এবং ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পারিবারিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। ঋণ খেলাপি একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। তবে আর্থিক খাতের সুবিধা হলো, সেখানে কিছু বিধিবদ্ধ নিয়মকানুন রয়েছে। এই নিয়মগুলোকে কার্যকর ও মান্য করতে হবে।

ব্যাংক কত টাকা ঋণ দিচ্ছে এবং কত টাকা ফেরত পাচ্ছে, কোনো ব্যাংকে অনিয়ম হলে কে দায়ী এবং কীভাবে দায়ী হবে—এই সকল ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা ও দৃশ্যমানতা বৃদ্ধি করতে হবে। এর মাধ্যমে আর্থিক খাতে সুশাসন ফিরে আসবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শেষ সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনের বিষয়ে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল। সরকার এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেছে যে নির্বাচিত সরকার বিষয়টি বিবেচনা করবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারে, তাহলে আর্থিক খাতে যত চেষ্টাই করা হোক না কেন, সংস্কার সম্ভব হবে না। তাই নতুন সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।