গণতন্ত্রের স্থায়িত্ব চায় অর্থনীতির মুক্তি, ব্যাংকিং সংস্কারই মূল চাবিকাঠি
অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া গণতন্ত্র অস্থায়ী, ব্যাংকিং সংস্কার জরুরি

গণতন্ত্রের বারবার পুনরুজ্জীবন, কিন্তু অর্থনীতির মুক্তি এখনো অধরা

বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাস একাধিকবার আহত হওয়া ও পুনরুদ্ধারের গল্প বলে। আহত পাখির মতো ডানা ঝাপটিয়ে বারবার ফিরে এসেছে গণতন্ত্র, কিন্তু অর্থনৈতিক মুক্তি সেই ১৯৭১ সাল থেকেই অপেক্ষমান। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ছাড়া গণতন্ত্রের প্রকৃত প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়, এটি একটি অনিবার্য সত্য।

অর্থনৈতিক মুক্তিই প্রকৃত স্বাধীনতা

ধরুন, একজন ব্যক্তি পূর্ণাঙ্গভাবে স্বাধীন; কিন্তু তার হাতে কোনো প্রকার অর্থকড়ি নেই। অর্থ ছাড়া সেই ব্যক্তি দুই পা-ও চলতে পারবে না। যদি চলেও, তাহলে তাকে কারো না কারো সহযোগিতা নিতে হবে। তাহলে কি তাকে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন বলা যায়? তাই নির্বাচনের পর সরকার গঠিত হলেও এবার প্রয়োজন জাতীয় ঐক্যের—যেখানে মিলবে অর্থনীতির মুক্তি।

১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ থেকে বর্তমান অবধি

দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের পরে দেশ একটি অস্থিতিশীল অবস্থায় চলে যায়। এরপর বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করে ১৯৯১ সালে গণতন্ত্র পুনরুজ্জীবিত হয়। কিন্তু সেই গণতন্ত্রই আবার অবরুদ্ধ হয়ে যায়। সেখান থেকে পুনরায় ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের মাধ্যমে উত্তরণ হচ্ছে বলে অনেকে ধরে নিতে চাইছেন। কিন্তু অর্থনীতি এমন এক অবস্থায় রয়েছে যেখান থেকে উত্তরণে কঠিন পথ পাড়ি দিতে হবে।

কৃষিপ্রধান দেশে কৃষিপণ্য আমদানির পরিতাপ

বাংলাদেশের মাটি অত্যন্ত উর্বর। এখানে সব ধরনের শস্য ব্যাপকভাবে উৎপাদন সম্ভব এবং দেশের চাহিদা পূরণ করে বিদেশে রপ্তানি করাও সম্ভব। শুধু দক্ষ ব্যবস্থাপনার অভাবে এবং সঠিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হওয়ার ফলে খাদ্যপণ্য বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে। অতি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের যে চুক্তি হয়েছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশ সাড়ে ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কৃষিপণ্য আমদানি করবে। এতে বাংলাদেশ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ঘাটতিতে পড়তে পারে। শুধু তা-ই নয়, এই পণ্যগুলোকে শুল্কমুক্ত সুবিধাও দিতে হবে ফলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কোষাগার ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সুতরাং চারদিক থেকেই বাংলাদেশ ক্ষতির মুখে পড়বে বলে অনেক অর্থনীতিবিদ আশঙ্কা করছেন।

পিএমআই সূচকে নিম্নগামী প্রবণতা

দেশের অর্থনীতির প্রধান চারটি খাত অর্থাৎ কৃষি, উৎপাদন, নির্মাণ ও সেবা খাত, যার ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের সামগ্রিক পিএমআই সূচক নির্ধারণ করা হয়। যেখানে দেখা যায়, গত বছরে জানুয়ারিতে সামগ্রিক পিএমআই সূচক ছিল ৬৫ দশমিক ৭, অথচ এই বছর একই সময় ৫৩ দশমিক ৯। অর্থাৎ বৃদ্ধি না পেয়ে আরো কমেছে। সুতরাং অর্থনীতির মুক্তি থেকে আরো দূর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

ব্যাংকিং খাত: অর্থনীতির কেন্দ্রীয় খুঁটি

এসব বিবেচনায় নিয়ে ব্যাংক খাতে ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন। কারণ, মোট দেশজ উৎপাদন, মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রেমিট্যান্স (প্রবাসী আয়) এবং রপ্তানি ও আমদানি যা কিছুই বলি না কেন, এর পেছনে যে নিয়ামক ব্যবহার করে তা হলো ব্যাংক। অর্থনীতির উপরিউক্ত যে উপাদানগুলো রয়েছে এর পিছনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যে নিয়ামক কাজ করে তা হলো ব্যাংক।

টংয়ের দোকানের উদাহরণ

একটি উদাহরণ দেওয়া যাক—পাহাড়ি জনপদের টংয়ের চায়ের দোকানে সাধারণত কয়েকটি খুঁটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। চারপাশে যত খুঁটিই থাকুক না কেন, মাঝখানের খুঁটিটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী। বাইরের খুঁটিগুলো তুলনামূলকভাবে কিছুটা দুর্বল হলেও সমস্যা হয় না, যতক্ষণ পর্যন্ত মাঝে খুঁটিটি দৃঢ় থাকে। কিন্তু যদি সেই কেন্দ্রীয় খুঁটিটি দুর্বল হয়ে যায় বা নষ্ট হয়, তাহলে অল্প সময়ের মধ্যেই পুরো টংয়ের দোকানটি যে কোনো ঝড় বা চাপেই ভেঙে পড়ে।

ঠিক একইভাবে যে কোনো দেশের অর্থনীতির ক্ষেত্রেও একটি শক্ত কেন্দ্রীয় খুঁটি রয়েছে, তা হলো ব্যাংকিং খাত। দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে শুরু করে শিল্প, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, রপ্তানি— সবকিছুই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। অর্থনীতির অন্য উপাদানগুলো যেন সেই টংয়ের বাইরের খুঁটি, আর ব্যাংকিং খাত হলো মাঝখানের প্রধান খুঁটি।

ব্যাংকিং খাতের অবহেলা ও পাচার

মোদ্দা কথা, বাংলাদেশে এই কেন্দ্রীয় খুঁটিটিই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্তর থেকে সংগৃহীত অর্থ ব্যাংকিং খাত ব্যবহার করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন দেশের উৎপাদন ও বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, অন্যদিকে ব্যাংকিং খাত নিজেই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। কারণ সাধারণ গ্রাহক যারা আছেন তারা তাদের আমানতের জন্য ব্যাংকের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন।

একীভূতকরণ ও নড়বড়ে অবস্থা

বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করলেও তার সফলতার তিল পরিমাণ অবস্থানও লক্ষ করা যায় না। আরো কিছু ব্যাংকের অবস্থা বেশ নড়বড়ে। এমতাবস্থায় ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফেরানোই হবে বর্তমান সরকারের মূল চ্যালেঞ্জ।

মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও ঋণ আদায়ের গুরুত্ব

আস্থা ফেরাতে হলে অবশ্যই খেলাপি ঋণ আদায়ের অধিকতর কঠোর হতে হবে অথবা টাকা ছাপিয়ে গ্রাহকদের আমানত ফেরত দিতে হবে। টাকা ছাপিয়ে ব্যাংকিং খাতে সহযোগিতা করলে তা হবে আত্মঘাতী। কারণ টাকা ছাপালে মূল্যস্ফীতি অনেক বেড়ে যাবে। বর্তমানে মূল্যস্ফীত কিছুটা স্থির হলেও তা এখনো জনসাধারণের নাগালের বাইরে রয়েছে। তাই মূল্যস্ফীতিও নিয়ন্ত্রণে আনা বা নাগালের মধ্যে আনা এ সরকারের অন্যতম একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে থাকবে।

ঋণ আদায়ের অপসংস্কৃতি

বাংলাদেশে ঋণ নিয়ে ঋণ পরিশোধের যে অপসংস্কৃতি চালু রয়েছে, তা পরিহার করে ঋণ আদায়ের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। কিন্তু টাকা ছাপিয়ে ব্যাংক খাতে স্বস্তি ফেরালে ঋণগ্রহীতারা বারবার পার পেয়ে যাবে, যা অর্থনীতির জন্য কখনোই সুখকর হবে না। তাই টাকা ছাপিয়ে ব্যাংকিং খাতে স্বস্তি ফেরানোর চেয়ে ঋণ আদায় হবে অর্থনীতির জন্য উত্তম একটি পন্থা।

ভবিষ্যতের পথ

বর্তমান সরকারের সেই পন্থাই বেছে নেওয়া হবে আরো বেশি উত্তম। কারণ ব্যাংকিং খাত স্থির হলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে কর্মসংস্থান বাড়বে, বাংলাদেশের জিডিপির উন্নয়ন হবে। তবেই মিলবে অর্থনীতির মুক্তি। তাই ব্যাংকিং খাতকে গুরুত্ব দিয়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়ে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে সুশাসন। তবেই মুক্তি মিলবে অর্থনীতির এবং গণতন্ত্রও পূর্ণপ্রতিষ্ঠিত হবে স্থায়ীভাবে।

লেখক : ব্যাংকার ও কলামিস্ট