আগাম বন্যায় ফসল ডুবে যাওয়ায় কৃষকরা যখন আহাজারি করছে, তখন গণমাধ্যমে বড় হেড লাইন— ৪৫ হাজার ৪০৮ কোটি টাকায় বোয়িংয়ের ১৪ উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি। বাংলাদেশ উড়োজাহাজ কিনছে—একটি নয়, দুটি নয়, একসঙ্গে ১৪টি। এটা নিঃসন্দেহে অনেক বড় খবর। চরম অর্থসংকটে জর্জরিত দেশের জন্য তো বটেই। হাওরের ‘সামান্য’ ফসল নষ্ট হওয়ায় কী যায় আসে? আসলে আমরা এমন এক সমাজে বাস করি, যেখানে ‘গরিবের ঘোড়া রোগ’ কিংবা ‘হাতি পোষা’ শুধু প্রবাদ নয়, নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও কখনও কখনও অদৃশ্য নির্দেশনা হয়ে ওঠে। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—এই বিশাল ব্যয়ের সিদ্ধান্ত কতটা প্রয়োজনীয়, কতটা যৌক্তিক, আর কতটা স্বচ্ছ? বিপুল রাজস্ব ঘাটতির দেশে এই টাকা কোথা থেকে আসবে? আর বোয়িং-ই বা কেন?
বিশাল অঙ্কের চুক্তি: প্রয়োজন বনাম অগ্রাধিকার
৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের এই চুক্তি নিঃসন্দেহে বড়। টাকার অঙ্কে যা দাঁড়ায় প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এই টাকা দিয়ে একটি দেশের স্বাস্থ্য, শিক্ষা বা অবকাঠামোর একাধিক খাতে আমূল পরিবর্তন আনা সম্ভব। সেখানে বিমান বহর বাড়ানোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে বিতর্ক থাকা অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকটজনক, ঋণের চাপ বাড়ছে, মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস তোলার অবস্থা করেছে— সব মিলিয়ে অর্থনীতির ভেতরে চাপ স্পষ্ট।
বৃহত্তর কাঠামো: পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির শর্ত
কিন্তু শুধু উড়োজাহাজ কেনার চুক্তিই নয়, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও বিস্তর একটি কাঠামো, যা গত ফেব্রুয়ারিতে ড. মোহাম্মদ ইউনূস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা 'এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড' বা পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির আওতায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। অনেকে এই চুক্তিকে ‘গোলামী চুক্তি’ বলছেন। চুক্তির শর্তগুলো পড়লে মনে হয়, বাংলাদেশ স্বাধীন সত্তা হিসেবে নয়, বরং এক ধরনের আশ্রিত রাষ্ট্র! চুক্তির শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে— আমেরিকা থেকে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কিনতেই হবে, ফ্রান্সের এয়ারবাস কেনার আগের সিদ্ধান্ত বাতিল। শুধু তাই নয়, ১৫ বছরে ১৫শ কোটি ডলারের তেল কিনতে হবে। প্রতি বছর ৩৫০ কোটি ডলারের পণ্য কিনতে হবে। ১৫শ কোটি ডলার— বাংলা টাকায় যা প্রায় ১ লাখ ৮৪ হাজার কোটি টাকা। এই অর্থ দিয়ে দেশের বিদ্যুৎ, সড়ক, হাসপাতাল, স্কুল— কিনা করা যেতো!
শর্তগুলো আরও গভীরে যায়। সামরিক সরঞ্জামাদি কেনার পরিমাণ বাড়াতে হবে এবং অন্য কোথাও থেকে কেনার বিধিনিষেধ আছে। বিশেষ করে চীন থেকে তুলনামূলক কম মূল্যে যা কেনা হয়, তা কেনা যাবে না। আমেরিকান কোনও পণ্যে কোটা আরোপ করা যাবে না— অর্থাৎ শুল্ক অতি অল্প। কিন্তু নিজেদের পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে উচ্চ শুল্ক দিতে হবে। তাদের পণ্যের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না, কোয়ালিটি যা-ই হোক না কেন। অন্য কোথাও থেকে কিনতে হলে আমেরিকার অনুমতি নিতে হবে। আমাদের দেশি পণ্যের মান বাড়ে কিংবা দাম কমে— এমন কিছু করা যাবে না। দেশি পণ্য উন্নয়নে ভর্তুকি দেওয়া যাবে না। যেন আমরা এমন কিছু তৈরি করতে না পারি, যাতে তাদের পণ্য পিছিয়ে যায়। আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা যেখানে যা আছে, সব মেনে চলতে হবে। আমেরিকা তার নিরাপত্তার জন্য যেভাবে ব্যবস্থা নেয়, আমাদেরও ঠিক তেমনই তাল মিলিয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে। যাতে তারা খুব সহজেই আমাদের সব কিছু বুঝতে পারে।
বোয়িং কেনার যৌক্তিকতা ও ঝুঁকি
বোয়িং কেনার চুক্তি যখন এই বৃহত্তর কাঠামোর অংশ, তখন বিষয়টি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। সরকারি ব্যাখ্যায় বলা হচ্ছে, নতুন উড়োজাহাজগুলো জ্বালানি-সাশ্রয়ী, আধুনিক এবং বহর আধুনিকীকরণে সহায়ক হবে। আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণ, যাত্রীসেবার উন্নয়ন, এমনকি কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথাও বলা হচ্ছে। শুনতে ভালো লাগে, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে— এই প্রতিশ্রুতিগুলো কতটা বাস্তবভিত্তিক? অতীতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পরিচালন দক্ষতা, লোকসান, দুর্নীতি এবং অব্যবস্থাপনার ইতিহাস কি আমাদের এই আশাবাদে আস্থা রাখার সুযোগ দেয়?
বোয়িংয়ের সমালোচনা বিশ্বজুড়ে নতুন নয়। ৭৩৭ ম্যাক্স মডেলের দুটি ভয়াবহ বিধ্বংসী দুর্ঘটনা— ২০১৮ সালে ইন্দোনেশিয়ায় লায়ন এয়ার ও ২০১৯ সালে ইথিওপিয়ায় ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্সের বিমান বিধ্বস্ত হয়ে মোট ৩৪৬ জন যাত্রীর মৃত্যু— এখনও ভোলার মতো নয়। তদন্তে বেরিয়ে আসে, বোয়িং প্রতিযোগিতার বাজারে এগিয়ে থাকতে ইচ্ছাকৃতভাবে ফ্লাইট কন্ট্রোল সিস্টেমে ত্রুটি ঢেকে রেখেছিল। সেই প্রতিষ্ঠানের কাছেই বাংলাদেশ আজ হাত বাড়িয়ে অর্থ ব্যয় করছে। শুধু তাই নয়, এই উড়োজাহাজগুলো সরবরাহ শুরু হবে ২০৩১ সালের অক্টোবরে, শেষটি পৌঁছাবে ২০৩৫ সালে। অর্থাৎ আজকে কেনা হচ্ছে সেই ডিম, যার বাচ্চা ফুটে বের হবে প্রায় ছয় বছর পর। এত দীর্ঘ সময়ের মধ্যে বিশ্বের উড়োজাহাজ প্রযুক্তি আরও কতদূর এগোবে, সেই উড়োজাহাজগুলো তখন কতটা ‘আধুনিক’ থাকবে—সেটা বড় প্রশ্ন।
সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া ও স্বচ্ছতার অভাব
বিষয়টি আরও জটিল হয়, যখন সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার দিকে তাকাই। গত জুলাইয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব বোয়িংয়ের কাছ থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কিনতে ক্রয়াদেশ দেওয়ার কথা জানান। তখন ‘বিমান কর্তৃপক্ষ’ গণমাধ্যমকে জানিয়েছিল— এসব উড়োজাহাজ কেনা হবে কিনা, সে বিষয়ে তারা কিছুই জানে না। এরপর গত ৩০ ডিসেম্বর বিমান পরিচালনা পর্ষদে ১৪টি বোয়িং কেনার ‘নীতিগত’ সিদ্ধান্ত হয়। ‘নীতিগত’ শব্দটি অত্যন্ত ফাঁকা। নীতিগত সিদ্ধান্তের পর দরপত্র প্রক্রিয়া তো থাকার কথা, কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল ঢাকার একটি হোটেলে জাঁকজমকভাবে সরাসরি চুক্তি স্বাক্ষর। দরপত্র ছাড়া সরকারি ক্রয়ের এই সিদ্ধান্ত কীভাবে প্রতিযোগিতামূলক ও ন্যায়সঙ্গত হলো?
এখানেই আসে স্বচ্ছতার প্রশ্ন। এত বড় একটি চুক্তি, যার সঙ্গে যুক্ত প্রতিশ্রুতি ১৫ বছর ধরে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ও শিল্পনীতিকে বেঁধে দেবে, সেটি কি সংসদের আলোচনার মধ্য দিয়ে হয়েছে? অথচ দেশে এখন সংসদীয় গণতন্ত্র চলছে। এমন একটি চুক্তি নিয়ে সংসদে খোলামেলা আলোচনা হওয়া উচিত ছিল— কেন বোয়িং, কেন এয়ারবাস নয়, কেন এই মুহূর্তে, কেন এত দেরিতে সরবরাহ, কেন প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ তেল ও পণ্য আমেরিকা থেকেই কিনতে হবে, কেন দেশীয় শিল্পে ভর্তুকি দেওয়া যাবে না। জনগণের প্রতিনিধিদের কাছে এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সংসদ এ ব্যাপারে একেবারেই নীরব। বোয়িং নিয়ে আর্থিক বিশ্লেষণও হতাশাজনক। ডলার সংকটের মুহূর্তে এই বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা কোথা থেকে আসবে?
অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ
বিমানের কর্তারা জ্বালানি সাশ্রয়ের কথা বলছেন, কিন্তু প্রশ্ন হলো— এই উড়োজাহাজগুলো সেসব রুটে ব্যবহার করা হবে, সেখানে বর্তমানে পর্যাপ্ত যাত্রী আছে কিনা? মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার রুটে প্রতিযোগিতা কতটা তীব্র? এমিরেটস, কাতার এয়ারওয়েজ, তুর্কি এয়ারলাইন্সের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে বিমানের অবস্থান কী হবে? বিনিয়োগের রিটার্ন কত বছর পরে আসবে? সেই বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ যদি না থাকে, তাহলে এই কেনাবেচা কেবল বাহ্যিক জাঁজকমক ও অভ্যন্তরীণ শূন্যতার উদাহরণ হবে।
বাংলাদেশের এভিয়েশন সেক্টরে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। ১৯৯০-এর দশকে এয়ারবাস কেনা নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হয়েছিল। সেই শিক্ষা আমরা কতটুকু গ্রহণ করেছি? দরপত্র প্রক্রিয়া ফাঁকি দিয়ে সরাসরি চুক্তি করার যে সংস্কৃতি, তা যদি এভাবে চলতে থাকে, তবে এই বোয়িং কেনার মধ্যেও যে স্বার্থের দ্বন্দ্ব লুকিয়ে নেই, কে বলতে পারে?
উপসংহার: ঢাকা না ওয়াশিংটন?
অবশেষে প্রশ্ন ফিরে আসে— ঢাকা না ওয়াশিংটন? এই চুক্তির শর্তাবলি কি স্বাধীন জাতির জন্য গ্রহণযোগ্য? কোনও রাষ্ট্র কি এভাবে নিজের শিল্পনীতি, বাণিজ্যনীতি, এমনকি নিরাপত্তানীতি অন্য রাষ্ট্রের হাতে তুলে দিতে পারে? ড. ইউনূসের করা চুক্তির শর্তগুলো পড়লে মনে হয়, বাংলাদেশ নামক একটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে তাকে প্রতিবছর বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হবে আমেরিকান পণ্যে, আমেরিকান উড়োজাহাজে, আমেরিকান তেলে— যার কোনোটিরই বাস্তব প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট নয়। বোয়িং কেনায় লাভ নাকি ক্ষতি, সেটা সময়ই বলবে। তবে এটুকু নিশ্চিত— একটি দেশকে বাধ্য করিয়ে এতগুলো শর্ত মেনে নিতে বলা, যার অধিকাংশই তার নিজস্ব স্বার্থবিরোধী, তা কোনও সুস্থ সম্পর্কের পরিচয় বহন করে না। বোয়িংয়ের ডানায় ভর করে বিমান যদি স্বপ্নের দেশে পৌঁছাতে পারে, তবে সমালোচনা অর্থহীন হবে। কিন্তু পৌঁছাতে না পারলে, তখন জবাবদিহির প্রশ্ন অনিবার্য। আর ততদিনে হয়তো চুক্তির আড়ালে হাতের স্বাক্ষর করা কাগজগুলো ধূলো মেখে পুরনো হয়ে যাবে— যেমন হয়ে যায় এই দেশের আরও কত অমীমাংসিত ক্রয়চুক্তি।



