জিনওয়ার: সিরিয়ায় নারীদের স্বাধীনতার গ্রাম, যেখানে পুরুষদের রাত কাটানো নিষেধ
জিনওয়ার: সিরিয়ায় নারীদের স্বাধীনতার গ্রাম

সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কামিশলি শহরের বাইরে জিনওয়ার গ্রামটি নারী ও শিশুদের জন্য এক নিরাপদ আশ্রয়স্থল। ২০১৮ সালে যাত্রা শুরু করা এই গ্রামে কুর্দি, আরব ও ইয়াজিদি নারীরা একত্রে বসবাস করেন। এখানে পুরুষদের প্রবেশ শুধু পরিদর্শক হিসেবে, বসবাস বা রাত কাটানো নিষিদ্ধ।

গ্রামের পটভূমি ও অর্থ

জিনওয়ার নামটি কুর্দি শব্দ ‘জিন’ (নারী) এবং ‘ওয়ার’ (ঘর বা স্থান) থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘নারীস্থান’। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় সহিংসতা ও বৈষম্যের শিকার নারীরা এখানে নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা খুঁজে পান। গ্রামে প্রায় ২৫ জন নারী ও তাদের সন্তানরা বাস করেন। নিজেদের হাতে মাটি, পানি ও খড় দিয়ে তৈরি ইট দিয়ে ঘর তৈরি করেছেন এবং নিজেদের স্কুলও গড়ে তুলেছেন।

নারীদের জীবন ও সংগ্রাম

৫৫ বছর বয়সী ওয়েলাত স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর এক বছরের বেশি আগে জিনওয়ারে আসেন। তিনি বলেন, ‘জীবনটা ঠিকঠাক চলছিল না, বেঁচে ছিলাম কোনোমতে। এখানে আমি নিজেকে খুঁজে পেয়েছি, আমার প্রকৃত সত্তাকে।’ ওয়েলাত প্রতিদিন সকালে কুর্দি ভাষার ক্লাসে অংশ নেন এবং গ্রামের প্রবেশপথে পাহারার দায়িত্ব পালন করেন। তিনি আরও বলেন, ‘মায়েরা এখানে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেন। সম্পর্কগুলো অত্যন্ত চমৎকার। মনস্তাত্ত্বিক পরিবেশ ভালো এবং সবার মনোবল দৃঢ়।’

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

৫৭ বছর বয়সী নুজিন মিহেমেদ স্বামীর মৃত্যুর পর সাড়ে চার বছর আগে জিনওয়ারে আসেন। তিনি বলেন, ‘আমি অনেক ভুগেছি। তথাকথিত নৈতিকতা এবং সমাজ—দুই দিক থেকেই নিপীড়িত। এখানে আমরা সবাই একটি পরিবারের মতো। যে কাজই থাকুক, আমরা তা একসঙ্গেই করি।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জেসমিনের গল্প

২৮ বছর বয়সী জেসমিন স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর পাঁচ বছর আগে জিনওয়ারে আসেন। তিনি জার্মানি যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, কিন্তু গ্রামটির খোঁজ পেয়ে সবকিছু বদলে যায়। তিনি বলেন, ‘সব ধর্ম ও বর্ণের নারীরা এখানে একসঙ্গে বসবাস করেন। সব ধর্মের উৎসব উদযাপিত হয়। এই গ্রামটি বিশ্বের জন্য বিপ্লব ও শান্তির দৃষ্টান্ত। এখন অন্য কোনো শহরে নিজেকে কল্পনা করাও কঠিন।’ জেসমিন আশা করেন, নারীরা রাজনীতি, শিক্ষা ও সামাজিক নেতৃত্বে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করবেন।

জারুদি গ্রাম ও নারী নাগরিক প্রতিরক্ষা

উত্তর-পূর্ব সিরিয়ার আরেকটি গ্রাম জারুদি তৃণমূল পর্যায়ের সামষ্টিক কাঠামো ও সমবায়ের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এখানে নারী ও পুরুষ উভয় কৃষি ও দৈনন্দিন কাজ ভাগ করে নেন। ২৮ বছর বয়সী নেসরিন বোজা এক বছর আগে জারুদিতে আসেন এবং গ্রাম পরিষদের সদস্য হিসেবে নারী শিক্ষা ও সামাজিক সংগঠন নিয়ে কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘এখানে আসার পর থেকে আমার রাগ কমেছে এবং সহযোগিতাপরায়ণ হয়েছি। আমরা সবাই সমান, আমাদের সামষ্টিক মনোবল দৃঢ়।’

কামিশলিতে ‘এইচপিসি-জিন’ নামে একটি নারী নাগরিক প্রতিরক্ষা কমিটি রয়েছে, যা বেসামরিক সুরক্ষা ও সামাজিক সংহতি বজায় রাখে। সদস্য রমজিয়ে মিহেম্মেদ ইসমাইল বলেন, ‘আমি যুদ্ধ চাই না, শান্তি চাই।’ আরেক সদস্য নিসমিয়ে ইমসেদিন বলেন, ‘আত্মরক্ষা অপরিহার্য, বিশেষ করে নারীদের জন্য। আমরা নারী, আমরা কষ্টে অভ্যস্ত এবং লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত।’ ওয়াদেন হুসেন সেখমুস ৪০ বছর গেরিলাদের বার্তাবাহক হিসেবে কাজ করেছেন এবং বলেন, ‘স্বাধীনতা অর্জন না করা পর্যন্ত আমরা থামব না।’

স্বনির্ভরতা ও ভবিষ্যৎ

জিনওয়ারের নারীরা নিজেদের খাদ্য নিজেরাই উৎপাদন করেন—বেগুন, টমেটো, মরিচ, শসা, পেঁয়াজ ও রসুন। গ্রামের প্রবেশপথে পাহারা দেন এবং দর্শনার্থীদের সঙ্গে ব্যবসা ও আলাপচারিতা করেন। ওয়েলাত বলেন, ‘আমি চাই, পৃথিবীর সব মা তাঁদের নিজেদের শক্তি সম্পর্কে সচেতন হোক। তাঁদের শক্তি হবে তাঁদের স্বাধীনতা।’