কুমিল্লার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে মাছভর্তি একটি পিকআপ দুর্ঘটনাক্রমে খালে পড়ে গেলে চালক গাড়ির ভিতরে আটকা পড়েন। জীবন রক্ষার জন্য তিনি আকুল চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু আশপাশের লোকজন তাকে উদ্ধারে এগিয়ে আসার পরিবর্তে খালে ঝাঁপিয়ে পড়ে মাছ লুট করতে থাকে। মুহূর্তের মধ্যেই জীবন্ত মাছ বালতি, বস্তা ও পলিথিনে ভরে নিয়ে যাওয়া হয়। অসহায় চালক ও তার সহকারী শেষ পর্যন্ত নিজেদের চেষ্টাতেই প্রাণ বাঁচিয়ে বের হতে বাধ্য হন।
মানবতার চরম বিপর্যয়
দুর্ঘটনার মুহূর্তে এমন নির্মম উদাসীনতা কেবল আইনের নয়, মানবিকতারও চরম বিপর্যয়। ঠিক একই চিত্র দেখা যায় বিদেশের মাটিতে—ভূমিকম্পকবলিত ভেনিজুয়েলায়। ভয়াবহ ভূমিকম্পে অসংখ্য মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে জীবন-মৃত্যুর সাথে লড়ছে, তখন একদল দুর্বৃত্ত তাদের উদ্ধারের পরিবর্তে দোকানপাট, ঘরবাড়ি, অফিসের মালামাল এমনকি ফার্মেসি পর্যন্ত লুট করতে ব্যস্ত। ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগের মুহূর্তে মানুষের বিপন্নতাকে সুযোগে পরিণত করা সভ্যতার পরিচায়ক নয়।
মানবতার এক অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত
অবশ্য, সেই ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে মানবতার এক অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্তও বিশ্ববাসীর হৃদয় স্পর্শ করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ছবিতে দেখা যায়, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন এক পিতা। তার শরীরের একটি অংশ বাইরে থাকলেও অপর অংশ কংক্রিটের নিচে আটকা। উদ্ধারকর্মীরা তাকে টেনে তুলতে চাইলে তিনি অনুরোধ করেন—তার হাত যেন না টানা হয়। কারণ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া সন্তানরা এখনো সেই হাত আঁকড়ে ধরে আছে। মৃত্যু যখন সম্মুখে, তখনো একজন পিতার হৃদয়ে নিজের প্রাণের আগে স্থান পেয়েছে সন্তান। এটাই মানবতার প্রকৃত রূপ, সভ্য সমাজের মানুষের প্রকৃত বৈশিষ্ট্য।
মানবতার জায়গায় কৌতূহল
আজকাল প্রায়ই দেখা যায়, সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তি সাহায্যের জন্য ছটফট করছেন, আর অনেকেই তাকে উদ্ধার না করে মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণে ব্যস্ত। মানবিকতার জায়গায় যখন কৌতূহল, দায়িত্ববোধের জায়গায় যখন আত্মস্বার্থ স্থান লাভ করে, তখন সমাজের নৈতিক ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। বিবেককে জাগ্রত করার পরিবর্তে আমরা যদি বিপন্ন মানুষের সম্পদ লুণ্ঠনে ব্যস্ত হই, তাহলে সৃষ্টির সেরা জীব বলে নিজেদের দাবি করার নৈতিক ভিত্তি কোথায়?
ধর্মীয় শিক্ষায় মানবতা
আমরা প্রায়শই ভুলে যাই, বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানো কেবল সামাজিক দায়িত্ব নয়; এটি ইমান ও কৃতজ্ঞতারও বহিঃপ্রকাশ। ধর্মীয় শিক্ষাও এটি। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি একটি প্রাণকে রক্ষা করিল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকেই রক্ষা করিল।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত ৩২)। ধর্মশিক্ষায় আরও বলা হয়, ‘জীবে দয়া করে যেই জন, সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।’ সুতরাং, সৃষ্টিকুলের অংশ হিসেবে কেন আমরা জীবের প্রতি সদয় আচরণ করব না? তাদের বিপদে এগিয়ে যাব না?
ইতিহাসের দৃষ্টান্ত
ইতিহাসে এমন বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে, যেখানে মানুষ নিজের জীবন বিপন্ন করেও অপরকে রক্ষা করেছে। আত্মত্যাগ ও মানবতার সেই শিক্ষাই ইতিহাসে তাদের করেছে চিরস্মরণীয়-বরণীয়। বিজ্ঞজনেরা বলে থাকেন, মানবসভ্যতার প্রকৃত শক্তি প্রযুক্তি, অর্থ কিংবা অট্টালিকায় নয়, বরং মানুষের প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতায়। দুর্যোগ, দুর্ঘটনা কিংবা বিপদের মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তা আমাদের মানবতার পরীক্ষা গ্রহণ করেন। সেই পরীক্ষায় যদি আমরা ব্যর্থ হই, তাহলে সকল গর্বই অর্থহীন হয়ে যাবে।



