মহিলা পরিষদের ৫৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে নারী অধিকার ও গণতন্ত্রের সংকট নিয়ে আলোচনা
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ৫৬তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর অনুষ্ঠানে সংগঠনটির সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম দেশে নারীবিদ্বেষী প্রচারণা এবং ঘৃণার সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টার তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, গত এক বছরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী বক্তব্য দেওয়ার দুঃসাহসও দেখানো হয়েছে। নির্বাচনে সেই অপশক্তির পরাজয় ঘটলেও সতর্ক থাকতে হবে, যাতে সেই শক্তি আবার সক্রিয় না হয়। গণতন্ত্র রক্ষায় সবাইকে আরও তীক্ষ্ণ নজর রাখতে এবং ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
ধর্মের অপব্যবহার ও নারী অধিকারের সংকট
ফওজিয়া মোসলেম অভিযোগ করেন, বাংলাদেশে ধর্মকে নারীর অধিকার ও সমতার প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ বা যৌতুকের মতো বিষয়গুলোকে ধর্মীয় দোহাই দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করার অপচেষ্টা চলছে। তিনি নারী অধিকার বাস্তবায়নে রাষ্ট্রের ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, সংবিধানে প্রদত্ত অধিকার এবং আন্তর্জাতিক সনদে করা অঙ্গীকারগুলো রক্ষায় রাষ্ট্রকে দায়বদ্ধ হতে হবে। নারীদের সুরক্ষায় দেশের বিচারিক কাঠামো বা বিচারব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর দাবি জানান তিনি।
৫৬ বছরের লড়াই ও নতুন প্রজন্মের আহ্বান
মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু স্বাগত বক্তব্যে বলেন, নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সামাজিক পরিবর্তনের লক্ষ্যে ৫৬ বছর ধরে লড়াই করা এই সংগঠনটি নতুন প্রজন্মের জন্য এক শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে। বৈষম্যহীন সমাজ গঠন এবং রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর পূর্ণ ও স্বাধীন অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই নারী আন্দোলনের মূল লক্ষ্য। সব বাধা ডিঙিয়ে অকুতোভয় যোদ্ধার মতো নিজেদের প্রাপ্য অধিকার ও মর্যাদা বুঝে নিতে তিনি তরুণদের প্রতি আহ্বান জানান।
ঘোষণাপত্রে ১৯টি দাবি ও ঐক্যের বার্তা
৫৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ঘোষণাপত্র পাঠ করেন মহিলা পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সীমা মোসলেম। তিনি মৌলবাদ, সন্ত্রাস ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে নারীসমাজসহ সব নাগরিককে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। ঘোষণাপত্রে ধর্ম–বর্ণনির্বিশেষে সম্পত্তিতে নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করাসহ নারীর সুরক্ষায় ১৯টি দাবি জানানো হয়। এ ছাড়া দেশের রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও নারীসমাজের প্রতি নারীর সুরক্ষায় জোরালো ভূমিকা রাখার আহ্বান জানানো হয়।
অর্থনৈতিক মুক্তি ও সামাজিক পরিবর্তনের গুরুত্ব
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে নারীর অধিকার ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন অপরিহার্য বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, মাথাপিছু আয় বাড়লেও যদি দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা নারীরা সুফল না পান, তবে সেই উন্নয়নকে সফল বলা যাবে না। শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ ন্যায্য মজুরি ও কর্মক্ষেত্রে উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিতের দাবি জানান তিনি। গৃহস্থালি কাজের স্বীকৃতি, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও কারিগরি সহায়তা বৃদ্ধি, সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিতে ভূমিকা রাখার ওপর জোর দেন সেলিম রায়হান।
নারী আন্দোলনের চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পথ
মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ডা. মাখদুমা নার্গিস নারী অধিকার ও সমতা প্রতিষ্ঠায় ৫৬ বছরের লড়াইয়ের স্মৃতিচারণা করে বলেন, নারীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করলেও সামাজিক মানসিকতা ও লৈঙ্গিক বৈষম্যের শিকল এখনো বিদ্যমান। ঘরে-বাইরে নারীর পূর্ণ মানবিক মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা আজও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। নারীদের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য তিনি উত্তরাধিকার আইনে সমান অধিকার নিশ্চিত করা অপরিহার্য বলে উল্লেখ করেন।
ওয়াইডব্লিউসিএ অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক হেলেন মনীষা সরকার নারী অধিকার ও অসাম্প্রদায়িক মানবিক সমাজ গঠনের লক্ষ্যে কয়েক প্রজন্মের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, লৈঙ্গিক বৈষম্য নিরসনে দীর্ঘ সময়ের চ্যালেঞ্জ থাকলেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অনুপ্রাণিত হয়ে সমমর্যাদার বাংলাদেশ গড়ায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
সাংবাদিক এবং কলামিস্ট মাহবুব আজীজ তৃণমূল পর্যায়ে নারী নির্যাতনের রূঢ় বাস্তবতা এবং আইনি জটিলতার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কেবল উচ্চবিত্ত নয়, সব শ্রেণির নারীই নির্যাতনের শিকার। নারীর প্রকৃত মুক্তি ও ক্ষমতায়ন তখনই সম্ভব, যখন সম্পত্তিতে তাঁদের সমান অধিকার নিশ্চিত হবে।
মহিলা পরিষদের সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার ফজিলা খাতুনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের শিক্ষার্থী ও গবেষণা সহকারী মাহামুদ খালিদ এবং উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী সৈয়দা সুরঞ্জনা।



