সোশ্যাল মিডিয়ায় নারীদের বিরুদ্ধে সংগঠিত যৌন হয়রানি: ডিসমিসল্যাবের বিশ্লেষণে উদ্বেগজনক চিত্র
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গ বা স্যাটায়ারের নামে নারীদের লক্ষ্য করে সংগঠিতভাবে যৌন হয়রানিমূলক আধেয় ছড়ানো হচ্ছে। তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাবের সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ফেসবুকের অন্তত পাঁচটি পেজ থেকে এ ধরনের আধেয় পরিকল্পিতভাবে প্রচার করা হচ্ছে, যার লক্ষ্য মূলত বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফল ও পরিচিত নারীরা।
বিশ্লেষণের সময়কাল ও পদ্ধতি
গত বছরের ১ অক্টোবর থেকে চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সাড়ে চার মাসে ডিসমিসল্যাব এসব পেজের চার হাজারের বেশি পোস্ট বিশ্লেষণ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, নারীদের নিয়ে করা উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পোস্টে যৌন আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। বিভ্রান্তি তৈরি করতে এসব পেজ ইচ্ছাকৃতভাবে মূলধারার সংবাদমাধ্যমের নাম, লোগো ও উপস্থাপনার ধরন অনুকরণ করছে, যা সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য প্রতারণামূলক হতে পারে।
পোস্টের ধারাবাহিক ধরন ও পরিসংখ্যান
ডিসমিসল্যাব পাঁচটি পেজ থেকে প্রকাশিত পোস্টের একটি ধারাবাহিক ধরন খুঁজে পেয়েছে। তা হলো, নারীদের নিয়ে করা প্রতি চারটি পোস্টে একাধিক যৌন আক্রমণাত্মক বা হয়রানিমূলক ভাষা ছিল। একই দিনে একাধিক পেজে হুবহু একই ফটোকার্ড প্রকাশ হতেও দেখা গেছে, যা সংগঠিত কার্যক্রমের ইঙ্গিত দেয়।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২৭৭টি হয়রানিমূলক ফটোকার্ডের মধ্যে সর্বোচ্চ ৬৬ শতাংশে লিঙ্গ বা যৌনতাভিত্তিক গালি ছিল। সাধারণ অপমান ছিল ২৫ শতাংশ আধেয়তে, আর বাকি ৯ শতাংশে ছিল আদর্শিক অবমাননা বা নারীদের শরীর ও পোশাক নিয়ে উপহাস। ডিসমিসল্যাবের বিশ্লেষণ করা পোস্টগুলোর মধ্যে ২৩ শতাংশ ছিল নারীদের নিয়ে, এবং সেগুলোর মধ্যে ২৮ শতাংশকে যৌন আক্রমণাত্মক বা হয়রানিমূলক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
লক্ষ্যবস্তু ব্যক্তিরা
ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানের সময়ে সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যবস্তু হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন অভিনেত্রী শবনম ফারিয়া এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শেহরিন আমিন ভূঁইয়া মোনামি। বিশ্লেষণ করা ২৭৭টি অপমানজনক ফটোকার্ডের মধ্যে ১৬১টিই ছিল অভিনেত্রী, মডেল বা অন্যান্য মিডিয়া ব্যক্তিত্বকে কেন্দ্র করে, যেখানে অভিনেত্রী পরীমনিকে নিয়ে করা হয়েছে ৬২টি ফটোকার্ড।
রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরাও বাদ যাননি। তাঁদের নিয়ে মোট ১০৩টি পোস্ট করা হয়েছে, যার মধ্যে ছিলেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) কয়েকজন সদস্য। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মধ্যে ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টির (এনসিপি) সাবেক নেতা এবং ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন, তাঁকে নিয়ে ১৭টি ফটোকার্ড তৈরি করা হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক রুবাবা দৌলা এবং লেখিকা তসলিমা নাসরিনকেও হয়রানির লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ ও ভুক্তভোগীদের মতামত
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী শেহরিন আমিন ভূঁইয়া মোনামি বলেন, "নারীর বিরুদ্ধে এই ধরনের আক্রমণের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো তাঁদের কণ্ঠস্বরকে থামিয়ে দেওয়া, যাতে জনপরিসরে তাঁরা কম দৃশ্যমান হয়ে ওঠেন। আক্রমণটি ব্যক্তিগত নয়, বরং তাঁদের সামাজিক ও রাজনৈতিক উপস্থিতিকে সংকুচিত করার একটি কৌশল।" তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বিরুদ্ধ মত দমনের ক্ষেত্রেও নারীদের হেয়প্রতিপন্ন করা হচ্ছে, এবং এই আক্রমণের একটি বড় অংশই ‘অবজেক্টিফিকেশন’, যেখানে নারীর বক্তব্যের পরিবর্তে তাঁর শরীর, পোশাক বা ব্যক্তিগত দিককে সামনে এনে মূল আলোচনাকে আড়াল করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক বি এম মইনুল হোসেন বলেন, "স্যাটায়ারের নামে হোক বা যে নামেই হোক অনলাইন মাধ্যমে নারীদের হয়রানি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। লাইক, ভিউ, শেয়ারের ফাঁদে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অবক্ষয় বেড়েই চলেছে। এসব ঘটনা প্রতিরোধে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে দ্রুত ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে।"
উপসংহার
ডিসমিসল্যাবের গবেষকেরা মনে করেন, এগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো ভুল নয়, বরং লিঙ্গভিত্তিক হয়রানির একটি ধারাবাহিক প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। পাঁচটি ফেসবুক পেজই বিভিন্ন মাত্রায় আক্রমণের এসব পদ্ধতি ব্যবহার করেছে, যা সামাজিক মাধ্যমের নিরাপত্তা ও নৈতিকতার প্রতি গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো হচ্ছে।



