জাতীয় সংসদে নারী প্রতিনিধিত্বের হতাশাজনক চিত্র
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে ৩০০ আসনের বিপরীতে নির্বাচিত নারী সদস্যের সংখ্যা মাত্র ৭ জন, যা দেশের রাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপে একটি গভীর বৈষম্যের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই ৭ জনের মধ্যে ৬ জন সরকারি দলের এবং একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়েছেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সংসদে বিরোধী দলটি জোটসহ ৭৭টি আসন পেলেও তাদের কোনও নারী সংসদ সদস্য নেই। ফলে টেলিভিশনে জাতীয় সংসদের অধিবেশন দেখলে কক্ষটিকে প্রায় নারীশূন্য মনে হয়, যা বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রকৃত চিত্রকে বিকৃত করে তুলছে।
সংরক্ষিত আসন ও প্রতিনিধিত্বের হিসাব
সংসদের এই অধিবেশনেই যদি ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়, তবে মোট নারী সংসদ সদস্যের সংখ্যা দাঁড়াবে ৫৭ জন। কিন্তু এতেও সংসদে নারী প্রতিনিধিত্বের হার হবে মাত্র ১৬ শতাংশ, যা দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি (৫০.৮৫ শতাংশ) নারীর সঠিক প্রতিফলন নয়। নারীর এই স্বল্প প্রতিনিধিত্ব আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ, রাজনৈতিক ঐতিহ্য এবং ক্ষমতাকাঠামোর হতাশাজনক দিককে উন্মোচিত করছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা ও গলদ
বাংলাদেশে বহুদিন ধরে নির্বাচনে যথাযথ নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে সব দল থেকে ৩৩ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়নের দাবি তোলা হচ্ছে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় কমিটিসহ দলীয় কমিটিতে অন্তত ৩৩ শতাংশ পদ নারীদের জন্য সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা থাকলেও ২০২৬ সালের নির্বাচনে নারী প্রতিনিধিত্বের এই করুণ চিত্র অত্যন্ত দূর্ভাগ্যজনক। গোড়ার গলদটি রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরেই রয়েছে। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক দলেই নীতিনির্ধারণী স্তরে নারীর উপস্থিতি ও অংশগ্রহণ কম। তৃণমূল পর্যায় থেকে বা রাজনৈতিক চর্চার মধ্য দিয়ে দলের নেতৃত্বের সামনের সারিতে উঠে এসেছেন— এমন নারীদের প্রায় দেখা যায় না বললেই চলে। ফলে নির্বাচনের আগে মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়টি দলের পুরুষ নেতারাই নিয়ন্ত্রণ করেন, যেখানে বর্তমান নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় অর্থ ও পেশি শক্তির বিবেচনায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নারীরা মনোনয়ন বঞ্চিত হন।
সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ও নিরাপত্তা সংকট
যারা সব বাধা অতিক্রম করে নির্বাচনে অংশ নেন, তাদের সামনে বিভিন্ন সামাজিক প্রতিবন্ধকতা রয়ে যায়। সম্প্রতি চাঁড়া দিয়ে ওঠা নারী বিদ্বেষ ও নারীর প্রতি সমাজের একটি অংশের নেতিবাচক মনোভাব তাদের চলার পথে বিরাট অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। অনেক নারী প্রার্থী ব্যক্তিগত ও ভয়াবহ সাইবার আক্রমণের শিকার হন, যা রাজনীতিতে তাদের অংশগ্রহণকে আরও কঠিন করে তোলে।
আন্দোলন থেকে অন্তর্ধানের রহস্য
একটি প্রশ্ন প্রায়ই উঠে আসে: আন্দোলন, সংগ্রামে, মিছিলে, স্লোগানে, সমাবেশে যে নারীরা সরব ও দৃশ্যমান থাকেন, পরে তাদের আর কোথাও দেখা যায় না কেন? তারা কি ইচ্ছা করে লুকিয়ে পড়েন, নাকি তাদের আড়ালে চলে যেতে বাধ্য করা হয়? দেখা যায়, অনেক নারীই আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকলেও এক পর্যায়ে তারা নিষ্ক্রীয় হয়ে যান। এর পেছনে নানা কারণ বিদ্যমান:
- প্রথমত: নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গী বদলায়নি, এবং নারী বিদ্বেষী উগ্র মনোভাব এখনও সমাজের নানা স্তরে রয়ে গেছে।
- দ্বিতীয়ত: দীর্ঘ সময় দেশে নারী নেতৃত্ব ও নারী প্রধান রাজনৈতিক দল থাকার পরেও সিসটেম্যাটিক বা নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে নারী এখনও উপেক্ষিত, এবং নারীর উপস্থিতি টোকেন হিসেবেই বিবেচিত হয়।
- তৃতীয়ত: রাজনৈতিক দলগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় এখনও অধিক সংখ্যক নারীর অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা যায়নি, নারী এখনও পেছনের সারির কর্মী হিসেবে রয়ে গেছেন।
সবশেষে বলা যায়, সমাজ, রাজনীতি ও সাইবার পরিসরে নারীর নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যময় চলাচল করার মতো সুস্থ পরিবেশের অভাব রয়েছে। রাজনীতি করতে এসে অনাকাঙ্ক্ষিত সাইবার বুলিং বা হয়রানির শিকার কেউ হতে চান না, তাই এক্ষেত্রে কঠোর আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।
জোরালো কণ্ঠস্বরের আহ্বান
সংসদে শুধু সাত নারীর মৃদু কণ্ঠস্বর নয়, শত নারীর জোরালো কণ্ঠস্বর শুনতে চাই। সবাইকে মনে রাখতে হবে, জাতীয় সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর দাবি শুধু নারীর অধিকার নয়, দেশের গণতন্ত্রের ভিত শক্তিশালী করার জন্যও এটা অত্যন্ত দরকারি। নারীর সমান ও ন্যায্য অংশগ্রহণ ছাড়া এই সংসদ বা গণতন্ত্র পূর্ণতা পাচ্ছে না, যা আমাদের সমাজের অগ্রগতির জন্য একটি বড় বাধা হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।



