বাংলাদেশে রাজনীতিতে নারী নেতৃত্বের সংকট: সংসদ ও রাজপথে কেন কমছে নারীর উচ্চকণ্ঠ?
বাংলাদেশে রাজনীতিতে নারী নেতৃত্বের সংকট: সংসদে কেন কমছে নারীর উচ্চকণ্ঠ?

বাংলাদেশে রাজনীতিতে নারী নেতৃত্বের ক্রমাগত সংকট: একটি গভীর বিশ্লেষণ

প্রায় চার দশক ধরে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান হিসেবে নারীদের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বেও ছিলেন নারীরা। বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া আমৃত্যু দলীয় নেতৃত্ব দিয়েছেন, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করলেও দলের নেতৃত্বে বহাল রয়েছেন। এই দুই নেত্রীই বিভিন্ন সময়ে সরকার বা বিরোধী দলের আসনে দায়িত্ব পালন করেছেন, যা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।

সংসদে নারী নেতৃত্বের বর্তমান চিত্র

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে সরকার ও প্রধান বিরোধী দলে পুরুষ নেতৃত্বের প্রত্যাবর্তন ঘটেছে। ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতৃত্বে রয়েছেন তারেক রহমান, প্রধান বিরোধী দল জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। এই তিন দল থেকেই সংসদে উল্লেখযোগ্য নারী নেতৃত্ব উঠে আসেনি। বিএনপি মাত্র ১০ জন নারীকে মনোনয়ন দিলেও তাদের মধ্যে মাত্র ৬ জন নির্বাচিত হয়েছেন। জামায়াতসহ ধর্মভিত্তিক দলগুলো নারীদের কোনো মনোনয়নই দেয়নি, আর জাতীয় নাগরিক পার্টির মনোনীত নারী প্রার্থীরাও বিজয়ী হতে পারেননি।

নির্বাচিত নারী এমপিদের মধ্যে বেশিরভাগই পারিবারিক পরিচয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করেছেন, যা তাদের স্বাধীন ভূমিকা পালনে বাধা সৃষ্টি করছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে সংরক্ষিত আসনে নির্বাচিত হয়ে সংসদে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা এবার দলবহিষ্কৃত হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয়ী হলেও তার প্রভাব সীমিতই রয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রাজপথে নারী নেতৃত্বের শূন্যতা

অতীতে রাজনৈতিক দলের নারী নেত্রীরা রাজপথ থেকে উঠে এসে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতেন। আওয়ামী লীগের সাজেদা চৌধুরী, মতিয়া চৌধুরী, বিএনপির রাবেয়া চৌধুরী, সেলিমা রহমান প্রমুখ নেত্রীরা ছাত্র রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তবে বর্তমানে রাজপথেও গ্রহণযোগ্য নারী নেতৃত্বের অভাব প্রকট। জামায়াতের নারী নেত্রীরা সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করলেও তাদের প্রভাব সীমিত, এবং নতুন দলগুলোর নারী নেত্রীরাও এখনো নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে পারেননি।

নারী নেতৃত্ব হ্রাসের কারণসমূহ

বিশ্লেষকরা মনে করেন, নারী নেতৃত্ব কমে যাওয়ার পেছনে নিম্নলিখিত কারণগুলো দায়ী:

  • নারী বিদ্বেষের বিস্তার ও উগ্র দক্ষিণপন্থি শক্তির প্রভাব
  • পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর দৃঢ়তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর সীমিত অংশগ্রহণ
  • সামগ্রিক নিরাপত্তাহীনতা যা নারীদের জনপরিসরে অংশগ্রহণে নিরুৎসাহিত করছে
  • রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরেও পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার বিদ্যমানতা
  • নির্বাচনে প্রধান দলগুলো নারীদের আনুপাতিক হারে মনোনয়ন না দেওয়া

বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির নেত্রী লাকি আক্তার বলেন, "সংগঠনের অভ্যন্তরেও পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা বিদ্যমান, যা নারীদের নেতৃত্বে উঠে আসার পথ সংকুচিত করে।"

সমাধানের পথ সম্পর্কে নারী নেত্রীদের মতামত

জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন উল্লেখ করেন যে ক্যারিয়ারসম্পন্ন নারী নেতৃত্বের অভাব দীর্ঘদিনের। তিনি বলেন, "এবারও যারা সংসদে গেছেন, তাদের মধ্যে সত্যিকার অর্থে কতজন আইন প্রণয়নে ভূমিকা রাখতে সক্ষম? কারণ এসব নেত্রীদের বেশিরভাগই এসেছেন পারিবারিক বৃত্ত থেকে।" তিনি সাইবার বুলিংকেও একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত করেন।

মহিলা জামায়াতের নেত্রী প্রকৌশলী মারদিয়া মমতাজ মনে করেন, প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে নারীবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গি লালন করতে হবে। তিনি বলেন, "এক্ষেত্রে বাবা-স্বামীর পরিচয়ে নয়— নিজেদের পরিচয়েই অবস্থান তৈরির মানসিকতা লালন করতে হবে নারীদের। জোর দিতে হবে তৃণমূলে।"

জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহম্মেদ দাবি করেন যে তাদের দল সব সময় নারীবান্ধব এবং এবারও একমাত্র বিএনপি থেকেই কিছু নারী সরাসরি নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন। তবে তিনি নারীদের আরও সুযোগ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেন।

ভবিষ্যতের সম্ভাবনা ও সুপারিশ

নারী নেতৃত্বের এই সংকট কাটিয়ে উঠতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে:

  1. রাজনৈতিক দলগুলোতে নারীর এজেন্ডাকে গুরুত্বের সঙ্গে সামনে আনা
  2. তৃণমূল পর্যায়ে পরিকল্পিত কাজের মাধ্যমে যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে তোলা
  3. সংরক্ষিত আসন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে নারী প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি
  4. সাইবার বুলিং ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা দূর করতে কার্যকরী নীতিমালা প্রণয়ন

বাংলাদেশের লড়াকু নারীরা প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে অগ্রভাগে থেকেছে, তাই রাজনৈতিক দলগুলোতে নারী নেতৃত্বে এগিয়ে আনা এবং কাঠামোগত বৈষম্য দূর করা এখন সময়ের দাবি।