শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রে বেতন-ভাতার সংকট: কর্মজীবী মায়েদের দুশ্চিন্তা
রাজধানীর পান্থপথে অবস্থিত পানি ভবন কেন্দ্রে স্থাপিত শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রে দুই শিশু খেলছে, কিন্তু তাদের পেছনের গল্পটি উদ্বেগজনক। গত রোববার, জাতীয় গ্রন্থাগারে কর্মরত নাজনীন আখতার তাঁর ৬ বছরের ছেলে ও ১৪ মাস বয়সী মেয়েকে এই সরকারি দিবাযত্ন কেন্দ্রে রেখে এসেছিলেন। তবে তিনি জানতেন না যে, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে কেন্দ্র থেকে সেবাবিরতি বা কর্মবিরতির বার্তা দেওয়া হয়েছিল। সোমবার সকালে তিনি সন্তানদের নিয়ে এসে শুনলেন যে, শেষ পর্যন্ত কর্মকর্তা–কর্মচারীরা কর্মবিরতির সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন, ফলে তিনি সন্তানদের রাখতে পেরেছেন। কিন্তু এই অস্থিরতা তাঁর মতো অনেক কর্মজীবী মায়ের ঘুম হারাম করে দিয়েছে।
অভিভাবকদের উদ্বেগ ও সংকটের মুখ
গতকাল গ্রন্থাগারের দিবাযত্ন কেন্দ্রে গিয়ে নাজনীনের সঙ্গে দেখা হয়, যিনি কেন্দ্রের অনিশ্চয়তা নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তা প্রকাশ করেন। একইভাবে, পানি ভবনের দিবাযত্ন কেন্দ্রের অভিভাবক ফাতেমাতুজ যোহরা, যিনি পানি উন্নয়ন বোর্ডে চাকরি করেন, বলেন, ‘বেতন-ভাতার সমস্যার কথা শুনে আমার ঘুম হারাম হয়ে গেছে! দিবাযত্ন কেন্দ্র না থাকলে যে কী করব! ছেলেকে রাখব কোথায়? চাকরি করাই কঠিন হয়ে যাবে।’ তাঁর ছয় বছর বয়সী ছেলে জুনাইদ হাবিব জিয়ান ২০২৩ সাল থেকে এই কেন্দ্রে আছে।
তানজিলা মোস্তাফিজ নামের আরেক কর্মজীবী মা, যিনি ৯ মাস ধরে গ্রন্থাগার কেন্দ্রে তাঁর আড়াই বছর বয়সী সন্তানকে রাখেন, রোববার রাতে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পেয়ে সোমবার সকালে সন্তানকে কেন্দ্রে আনেননি। তিনি সাভারে ফুফুর বাসায় সন্তানকে রাখার পরিকল্পনা করেছিলেন, কিন্তু পরে জানতে পারেন কর্মবিরতির সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয়েছে। গতকাল ওই কেন্দ্রে দেখা যায়, ৬০টি শিশুর মধ্যে মাত্র ১৫টি উপস্থিত, কারণ অনেক অভিভাবক আগের দিনের বার্তা পেয়ে সন্তানদের নিয়ে আসেননি।
প্রকল্পের পটভূমি ও বর্তমান সংকট
মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের ‘২০টি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপন’ প্রকল্পের আওতায় এই কেন্দ্রগুলো পরিচালিত হচ্ছে। ঢাকায় পানি ভবন, ভূমি ভবন, মতিঝিল, পর্যটন করপোরেশনসহ মোট ১০টি এবং ঢাকার বাইরে আশুলিয়া, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, গোপালগঞ্জ, নওগাঁ, গাইবান্ধা, রংপুর, কক্সবাজার, নোয়াখালী ও চাঁদপুরে ১০টি কেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্রে ৪ মাস থেকে ৬ বছর বয়সী শিশুদের সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত রাখা হয়, মাসিক সেবামূল্য সর্বনিম্ন এক হাজার থেকে সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকা।
কিন্তু প্রকল্প চলমান থাকা নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং পাঁচ মাসের বকেয়া বেতন–ভাতা নিয়ে কেন্দ্রগুলোতে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। গত বছরের জুলাই মাসে প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়ানো হলেও, বেতন–ভাতা পরিশোধ ও ঠিকাদারদের বিল দেওয়া নিয়ে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ত্বরিত পদক্ষেপ না নেওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বাড়তি মেয়াদের জন্য ১১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা ছাড় হলেও অনুমোদন না হওয়ায় টাকা ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদারদের সমস্যা
ভূমি ভবনের দিবাযত্ন কেন্দ্রের কর্মকর্তা মাহিয়া তাসনুভ বলেন, গত বছরের জুলাই থেকে ৮ মাসের বেতন বকেয়া ছিল, ঈদের পর ২৪ মার্চ ৩ মাসের বকেয়া দেওয়া হয়েছে। তিনি ধার করে চলতে বাধ্য হয়েছেন। পান্থপথে পানি ভবনের কেন্দ্রের শিক্ষক রুমা আক্তারও বেতন বকেয়া থাকায় আর্থিক সংকটের কথা জানান। বকেয়া বেতন পরিশোধের দাবিতে মার্চ মাসেই দুবার কর্মবিরতির ঘোষণা দেন কর্মকর্তা–কর্মচারীরা।
খাবার সরবরাহকারী দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান—ঢালী এন্টারপ্রাইজ ও তামান্না ট্রেডিং করপোরেশন—৯ মাসের সোয়া কোটি টাকার বিল বকেয়া থাকায় ১ এপ্রিল থেকে খাবার সরবরাহ বন্ধ করার হুমকি দিয়েছে। ঢালী এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপক মুরাদ হোসেন বলেন, ৬ মাস ধরে তাঁরা বিলের জন্য মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে ছোটাছুটি করছেন, কিন্তু কোনো বিল পাননি। তামান্না ট্রেডিং করপোরেশনের কর্মকর্তা মো. আল মামুনও ৩৮ থেকে ৪০ লাখ টাকার বকেয়া থাকার কথা উল্লেখ করেন।
সমাধানের প্রচেষ্টা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
প্রকল্প পরিচালক অতিরিক্ত সচিব শবনম মোস্তারী জানান, তিন মাসের বকেয়া বেতন দেওয়া হয়েছে এবং বাকি বেতন শিগগির দেওয়া হবে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো যেন খাবার সরবরাহ অব্যাহত রাখে, সেটা নিয়েও আলোচনা চলছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রকল্পটি আরও টেকসই করা ও ২০২৮ সাল পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানোর পরিকল্পনা হয়েছে। তবে, রংপুরের দিবাযত্ন কেন্দ্রটি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বকেয়া ভাড়ার জন্য মালিক তালাবদ্ধ করেছিলেন, পরে জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপে খুলে দেওয়া হয়, যা সংকটের গভীরতা নির্দেশ করে।
এই পরিস্থিতিতে, কর্মজীবী মায়েরা যেমন নাজনীন ও ফাতেমাতুজ যোহরা, তাঁদের দৈনন্দিন জীবন ও চাকরি টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন। সরকারি এই সেবা বন্ধ হয়ে গেলে তাঁদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে, যা দেশের কর্মসংস্থান ও নারী ক্ষমতায়নের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।



