বরেন্দ্রের শুষ্ক মাটিতে নারীর পানির যুদ্ধ
‘ঠা ঠা বরিন্দ’—এই রুক্ষ ও শুষ্ক পরিচিতি বাংলাদেশের বরেন্দ্র অঞ্চলের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, বিশেষ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নাচোল উপজেলার প্রেক্ষাপটে। বছরের পর বছর ধরে এখানে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাচ্ছে, যা স্থানীয় জনজীবনে মারাত্মক সংকট সৃষ্টি করেছে। এই সংকটের সবচেয়ে বড় ও সরাসরি ভুক্তভোগী হচ্ছেন নারীরা, যাদের দৈনন্দিন জীবনযাপন পানির অভাবে ব্যাহত হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
সুমিত্রা হেমব্রম: একজন সাঁওতাল নারীর সংগ্রাম
নাচোল উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের মাড়কৈল গ্রামের বাসিন্দা সুমিত্রা হেমব্রম (৩৫) এই পানিসংকটের একটি জীবন্ত উদাহরণ। তিনি একজন সাঁওতাল নারী, যার স্বামীর নাম আসাম মুরমু এবং তিন সন্তানের মা। সুমিত্রার জীবনযাত্রা পানির খোঁজে একটানা সংগ্রামের ইতিহাস। তিনি স্মরণ করেন, একসময় গ্রামের নলকূপগুলো সম্পূর্ণ শুকিয়ে যাওয়ায় সেগুলো থেকে কোনো পানিই উঠত না। তখন তাকে দূরের একটি গভীর নলকূপ থেকে পানীয় জল সংগ্রহ করতে হতো, পাশাপাশি গবাদিপশুর জন্য পুকুর থেকে পানি আনতে হতো অত্যন্ত কষ্টকরভাবে।
পরবর্তীতে সরকারি উদ্যোগে গ্রামে একটি সাবমার্সিবল পাম্প স্থাপন করা হলে পানীয় জলের সংকট কিছুটা লাঘব হয়। কিন্তু এই সমাধানও সম্পূর্ণ নয়, কারণ গোসল ও গবাদিপশুর প্রয়োজনে এখনো তাকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরের একটি পুকুরে যেতে হয়। এই পুকুরটি আবার মাছচাষের জন্য বন্দোবস্ত দেওয়া থাকায় এর ব্যবহারও সীমিত ও জটিল।
অতি উচ্চ পানিসংকটাপন্ন এলাকার তালিকায় মাড়কৈল
গত বছর সরকার দেশের বিভিন্ন অঞ্চলকে পানিসংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে, যেখানে ডিসেম্বর মাসে অতি উচ্চ, উচ্চ এবং মধ্যম—এই তিন স্তরে বিভক্ত করে এলাকাগুলো চিহ্নিত করা হয়। সুমিত্রা হেমব্রমের বাসস্থান মাড়কৈল এলাকাটি অতি উচ্চ পানিসংকটাপন্ন এলাকার তালিকায় স্থান পেয়েছে, যা এই অঞ্চলের তীব্র সংকটেরই প্রতিফলন।
সুমিত্রা নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘পানির দুখ লিয়াই জীবন পার হোইলো। প্রায়ই কারেন্ট (বিদ্যুৎ) থাকে না। মটার (সাবমার্সিবল পাম্প) থাকিও পানি পাওয়া যায় না। হামরা তখুন খুব কষ্টে পড়ি। অনেক সময় রান্নার সময় হয়ে গেলেও বাড়িতে পানি থাকে না। তখুন গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে খুঁজে দেখতি হয়, কোথাও পানি মজুত আছে কি না।’
তার এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয় যে, বিদ্যুৎহীনতা সাবমার্সিবল পাম্পের কার্যকারিতাকে ব্যাহত করছে, ফলে পানির প্রাপ্যতা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে নারীদেরকে বাড়ি বাড়ি ঘুরে পানির সন্ধান করতে হচ্ছে, যা তাদের দৈনন্দিন কাজের চাপ ও মানসিক চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বরেন্দ্র অঞ্চলের ব্যাপক প্রভাব
বরেন্দ্র অঞ্চলের এই পানিসংকট কেবলমাত্র একটি পরিবারের সমস্যা নয়, বরং এটি সমগ্র সম্প্রদায়ের জন্য একটি গভীর সংকট। নাচোল উপজেলার মতো এলাকাগুলোতে কৃষি, পশুপালন ও গৃহস্থালি কাজ—সবকিছুই পানির উপর নির্ভরশীল। পানির অভাবে শুধু নারীরাই নয়, পুরো সমাজের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোই হুমকির মুখে পড়ছে।
সরকারি পদক্ষেপ সত্ত্বেও, স্থায়ী ও টেকসই সমাধানের অভাবে এই সংকট দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভূগর্ভস্থ পানির অত্যধিক ব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং যথাযথ পানিসংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাব এই সমস্যার মূল কারণ।
সুমিত্রা হেমব্রমের গল্প শুধু একটি ব্যক্তিগত সংগ্রাম নয়, বরং এটি বরেন্দ্র অঞ্চলের হাজার হাজার নারীর প্রতিনিধিত্ব করে, যারা প্রতিদিন পানির জন্য লড়াই করছেন। এই সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন, যা নারীদের জীবনযাত্রাকে সহজ করতে পারে এবং সম্প্রদায়ের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে।



