সপ্তম শতকের প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত জানা না গেলেও, ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল হয়ে আছেন রুফাইদা আল-ইসলামিয়া। মসজিদে নববীর আঙ্গিনায় মাটির দেওয়াল, খেজুর গাছের গুঁড়ি ও পাতা দিয়ে তৈরি সাধারণ তাঁবুতে তিনি অসুস্থদের শুশ্রূষা দিতেন। আহতদের ক্ষত ধুয়ে পরিষ্কার করা থেকে ব্যান্ডেজ বাঁধা—সব কাজেই ছিলেন নিবেদিত। তার মমতাময়ী আচরণ শুধু চিকিৎসায় সীমাবদ্ধ থাকত না, বরং রোগীদের মধ্যে উৎসাহ ও আশার সঞ্চার করত।
ইসলামি নার্সিংয়ের পথিকৃৎ
রুফাইদা আল-ইসলামিয়া, যিনি আসলামিয়া নামেও পরিচিত, ইসলাম ধর্ম গ্রহণকারী প্রথম নারীদের একজন। খাজরাজ গোত্রের বনু আসলাম শাখার সদস্য হিসেবে তিনি ৫৯৭ খ্রিস্টাব্দে ইয়াসরিব শহরে জন্মগ্রহণ করেন, যা পরবর্তীতে মদিনা নামে পরিচিত হয়। তার বাবা সাদ আল-আসলামি একজন চিকিৎসক ও সার্জন ছিলেন, এবং রুফাইদা তার সহকারী হিসেবে চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন করেন।
প্রথম হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা
মদিনার মসজিদে নববীতে ছোট একটি তাঁবুতে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন রুফাইদা, যেখানে অসুস্থদের চিকিৎসা করা হত। পরবর্তীতে, যুদ্ধক্ষেত্রে আহত সৈনিকদের চিকিৎসার জন্য ‘খেইমাহ আল-রুফাইদাহ’ নামে একটি ফিল্ড হাসপাতাল গড়ে তোলেন তিনি। এই চিকিৎসা কেন্দ্রটি ইসলামের প্রথম ‘হাসপাতাল’ বা ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসা সেবা ইউনিট হিসেবে স্বীকৃত, যা প্রয়োজনে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তরিত করা যেত।
ঐতিহাসিকদের মতে, এখানে ব্যান্ডেজ, ওষুধ, ভেষজ এবং তুলার বন্দোবস্ত ছিল। রুফাইদা নিজেই অভাবগ্রস্ত রোগীদের সেবার দায়িত্ব নিতেন। তার চিকিৎসা সেবার মধ্যে ছিল প্রাথমিক চিকিৎসা, জরুরি চিকিৎসা, গুরুতর আহতদের যত্ন, যুদ্ধক্ষেত্রে আহতদের পৃথকীকরণ, পুনর্বাসন এবং দীর্ঘমেয়াদী যত্ন। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধি বিবেচনায় কেন্দ্রটি স্থাপন করা হয়েছিল, যেখানে রোগীরা মরুভূমির কঠোর আবহাওয়ায়ও ছায়া ও পরিষ্কার পানীয় জল পেত।
প্রথম নার্সিং স্কুল ও প্রশিক্ষণ
রুফাইদা আল-ইসলামিয়া ৬২২ খ্রিস্টাব্দে প্রথম আনুষ্ঠানিক নার্সিং স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে ইসলামের নবী এবং তার সাহাবিদের কয়েকজনের স্ত্রীকে সেবিকা হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল, যাতে তারা যুদ্ধের সময় মুসলিম বাহিনীকে সহায়তা করতে পারেন। তিনি স্বেচ্ছাসেবী নার্সদের জন্য ব্যবহারিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করেন, প্রয়োজনীয় নার্সিং দক্ষতা শেখানোর মাধ্যমে তাদের আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তোলেন।
তার যোগাযোগ দক্ষতা ছিল অনন্য, যা শ্রদ্ধা, সততা, সত্যবাদিতা এবং আন্তরিকতার গুণাবলীর উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। তিনি স্বেচ্ছাসেবক নার্সদের জন্য পেশাদার আচরণের নীতি নির্ধারণ করেছিলেন, চিকিৎসা-পরবর্তী মূল্যায়ন ও রোগীদের অবস্থার ক্রমাগত পর্যবেক্ষণের উপর জোর দিতেন।
যোদ্ধার সম্মান লাভ
ইসলামের নবী মোহাম্মদ রুফাইদার চিকিৎসা সেবায় এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, তিনি বদর, উহুদ, খন্দক এবং খায়বারের যুদ্ধের সময় কিছু আহত সাহাবীকে সরাসরি তার কাছে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। ইমাম বুখারির ‘আল-আদাব আল-মুফরাদ’ এবং ইবনে সা’দের ‘আল-তাবাকাত’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে, খন্দকের যুদ্ধে সা’দ বিন মুয়ায গুরুতর আহত হলে তাকে রুফাইদার কাছে স্থানান্তর করা হয়।
নার্সদের চিকিৎসা সেবা দেখে ইসলামের নবী তাদের যুদ্ধরত সৈন্যদের সমান গনীমতের মাল দিয়েছিলেন, যা ওয়াকিদী ও ইবনে আব্দুল বার বর্ণনা করেছেন। এই সম্মান তাকে একজন যোদ্ধার মর্যাদায় উন্নীত করে।
সম্প্রসারিত সেবা ও উত্তরাধিকার
রুফাইদা আল-ইসলামিয়া শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই নয়, স্বাভাবিক সময়েও কমিউনিটি কেয়ার প্রদান করতেন। তিনি মদিনায় প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ভ্রাম্যমাণ ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের কাছে চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দিয়েছেন, এমনকি মরুভূমিতে তীব্র তাপে অজ্ঞান হয়ে পড়া ব্যক্তিদেরও সেবা করতেন। মুহাম্মদ নিহালের গবেষণা অনুসারে, তিনি বিশ্বের প্রথম প্যালিয়েটিভ কেয়ার ব্যবস্থা শুরু করেছিলেন, যা দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীদের শারীরিক কষ্ট কমানো ও মানসিক সমর্থন দিত।
তিনি নিজের সম্পত্তি চিকিৎসার কল্যাণে ব্যবহার করে ইতিহাসে প্রথম ‘বিনামূল্যের হাসপাতাল’ প্রতিষ্ঠা করেন। বদরের যুদ্ধের পর, ঘর ও অর্থ না থাকা আহত ব্যক্তিদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তুলেছিলেন। রুফাইদা শুধু চিকিৎসাই করতেন না, রোগীদের জন্য খাবারও তৈরি করতেন।
সৌদি আরবের প্রথম পিএইচডি নার্স ড. সুয়াদ হুসেন ১৯৮১ সালে তার উপর গবেষণা প্রকাশ করেন, যা আধুনিক যুগেও তার কাজ সম্পর্কে ধারণা দেয়। রুফাইদা নার্সিংয়ের উন্নতির জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, নতুন নীতি ও ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠা করে উন্নত নার্সিংয়ের ভিত্তি রচনা করেন।
পাকিস্তান ও ভারতসহ বিশ্বের বহু দেশে তার নামে নার্সিং ও সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয়েছে। প্রতি বছর বাহরাইনের আরসিএসআই বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চমানের নার্সিং সেবা প্রদানকারী শিক্ষার্থীদের রুফাইদাহ আল-ইসলামিয়া পুরস্কার দিয়ে থাকে। তার জীবনী আজও নার্সিং পেশার জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।



