উষারানী দেবী: সাধারণ জীবনের অসাধারণ বীরত্বের কাহিনী
গ্রাফিকস: প্রথম আলো। উষারানী দেবীর জীবনকথা জানার পর সেই জীবনসত্য অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার তাগিদ অনুভব না করে পারা যায় না। দূর মফস্বলের সাধারণ এক নারী তিনি, কিন্তু সমাজের সত্য তো সাধারণের মধ্যেই পায় সহজ আশ্রয়। প্রাত্যহিকতার ধারা বেয়েই চলে সাধারণের অনন্য হয়ে ওঠার সাধনা। এই প্রক্রিয়ার এমন এক সহজিয়া ভঙ্গি ও আড়াল থাকে যে অনেক সময় বিশিষ্ট ভূমিকা গ্রহণের মাহাত্ম্য সাদামাটা চোখে ধরা পড়ে না। উষারানী দেবীর পরিবার ও জীবনে অনেকগুলো প্রতীকী ব্যঞ্জনার দেখা মেলে, যা ব্যক্তির গভীরে সমাজসত্যের উদ্ভাসন প্রকাশ করে।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের 'বীর নারী' সম্মাননা
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের পক্ষ থেকে উষারানী দেবীকে সংবর্ধিত করার সময় তাঁকে অভিহিত করা হয়েছিল 'বীর নারী' হিসেবে। এই বীরত্বের সন্ধান মিলবে কোনো জঙ্গি ঘটনা বা সংঘর্ষে নয়, বরং আটপৌরে জীবনে হঠাৎ নেমে আসা হিংস্র সামরিক অভিঘাতের মোকাবিলায় এক সাধারণ নারীর নিত্যকার জীবনযাপনে জননী সাহসিকা হওয়ার মধ্যে। সংবর্ধনাপত্রে বলা হয়েছিল, কিশোরগঞ্জের বীর নারী উষারানী দেবীকে সম্মান জানাবার মাধ্যমে একই সঙ্গে সম্মান নিবেদন করা হচ্ছে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে অবদান-রচনাকারী লক্ষ লক্ষ নারীর প্রতি, যাঁরা চরম দুঃখ-কষ্ট-নির্যাতন ভোগ সত্ত্বেও দেশ ও সমাজের প্রতি কর্তব্যে ছিলেন অটল।
পারিবারিক পটভূমি: কালীকুমার ফকিরের উত্তরাধিকার
কিশোরগঞ্জের বিখ্যাত পণ্ডিত পরিবারে উষারানী দেবীর জন্ম। তাঁর ঠাকুরদা কালীকুমার পণ্ডিত কবিরাজ হিসেবে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন এবং 'কালীকুমার ফকির' নামেই তিনি অধিক পরিচিত ছিলেন। তিনি ছিলেন একাধারে সিদ্ধাচার্য পুরুষ ও কোরানে হাফেজ। তান্ত্রিক দর্শনে সিদ্ধি অর্জনের পাশাপাশি তিনি মইনটের 'শাহ পরান শাহ ফকির'-এর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর বসতবাড়িতে যেমন ছিল পূজামণ্ডপ, তেমনি ছিল ফকিরের দরগা। বাংলার উদারবাদী লোকধর্ম চেতনার ধারক এই সিদ্ধপুরুষ শতায়ু লাভ করেছিলেন এবং একাত্তরে পাকবাহিনীর তাণ্ডবের সাক্ষী হয়েছিলেন।
১৯৭১-এর নৃশংস হত্যাকাণ্ড ও পরিবারের বিপর্যয়
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকবাহিনীর আকস্মিক গণহত্যাভিযান শুরু হলে উষারানী দেবীর জীবনেও নেমে আসে অন্ধকার। ২২ মে শুক্রবার শেষ রাতে বাড়িতে মিলিটারি হানা দেয় এবং দুই পরিবারের ১০ জন সদস্যকে ধরে ডাকবাংলোর আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে অকথ্য নির্যাতনের পর রাতে ট্রাকে করে সিদ্ধেশ্বরী কালীবাড়ি ঘাটে নিয়ে তাঁদের গুলি করে হত্যা করা হয়। শহীদ হয়েছিলেন আটজন, যাঁদের মধ্যে ছিলেন উষারানী দেবীর স্বামী শিক্ষক নীরদরঞ্জন পণ্ডিত, বড় কাকা ক্ষিতিশচন্দ্র পণ্ডিত ও পিসেমশাই নগেন্দ্রচন্দ্র রায়।
ধৃত ১০ জনের মধ্যে মণীন্দ্রচন্দ্র পণ্ডিত ও রবিঠাকুর পণ্ডিত ছাড়া পেয়েছিলেন এক মুসলিম মহিলা লতার সাহসী হস্তক্ষেপের কারণে। তিনি পাকিস্তানি মেজরের সঙ্গে দেখা করে তাঁদের মুক্ত করার চেষ্টা করেন। এই অসমসাহসী মহিলার প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়।
অবরুদ্ধ শহরে জীবনসংগ্রাম ও ধর্মান্তরণের বেদনা
এই নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের পর শুরু হয় উষারানী দেবীর আরেক জীবনসংগ্রাম। অবরুদ্ধ কিশোরগঞ্জ শহরে থাকতে বাধ্য হন তিনি, কারণ পরিবারে আর কোনো পুরুষ-প্রধান নেই এবং বৃদ্ধ ঠাকুরদার সেবাযত্ন জরুরি। স্থানীয় দালাল ও রাজাকারের হামলা থেকে রেহাই পেতে ও শান্তি কমিটির সদস্যদের চাপে শেষ পর্যন্ত ধর্মান্তরণে বাধ্য হন উষারানী। এই ধর্মান্তরণ অর্থহীন হলেও মানসিক পীড়ন গুরুত্বহীন নয়।
পিতা জগদীশচন্দ্র পণ্ডিত এই খবর শুনে কন্যাকে লিখেছিলেন, 'স্নেহের উষারানী দেবী, আশীষ নিও। শুনিতে পারিলাম তুমি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করিয়াছ। ধর্মের মধ্যে ইসলাম শ্রেষ্ঠ ধর্ম। ইহাতে আমার কোনো আপত্তি নাই।' এর কিছুদিন পর তিনি ভারতে চলে যান এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন।
মুক্তিবাহিনীকে গোপন তথ্য সরবরাহ ও সাহসী ভূমিকা
২৮ জুলাই শহীদ নীরদরঞ্জন পণ্ডিতের পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করে। এরপর উষারানী দেবী স্থানীয় কিন্ডারগার্টেন স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। একদিন কুখ্যাত মেজর ইফতেখারের ডাকবাংলোয় যান তিনি। সেখানে দেয়ালে কিশোরগঞ্জের একটি মানচিত্র দেখতে পান, যেখানে ভৈরব থেকে শুরু করে হাওর এলাকা ব্যতীত সব স্থানের নামের আগে লাল গোল ছোপ আঁকা ছিল। তিনি বুঝতে পারেন, লাল ছোপ চিহ্ন যেসব জায়গায় নেই সেখানে মিলিটারি এখনো যায়নি, তবে শিগগিরই যাবে।
উষারানী দেবী সেই রাতেই বাবাকে চিঠি পাঠান ভাটি অঞ্চল ছেড়ে ভারতে চলে যাওয়ার জন্য। আরও গুরুত্বপূর্ণভাবে, তিনি ভাটি এলাকায় পাকবাহিনীর আসন্ন অপারেশন সম্পর্কে মুক্তিযোদ্ধাদের সতর্ক করে দেন। সাংকেতিক কোডে লেখা চিঠি পাঠান স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হামিদ ভাইয়ের কাছে, যিনি পরবর্তীতে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ হন।
যুদ্ধোত্তর জীবন ও অব্যাহত সংগ্রামী চেতনা
উষারানী দেবী বর্তমানে কিশোরগঞ্জে এস ভি গার্লস স্কুলে শিক্ষকতা করছেন। স্বামী সন্তোষ কুমার দাস ও পুত্রসন্তান নিয়ে সুখী সংসার গড়ে তুলেছেন। তিনি তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, 'বর্তমানে আমি যার আশ্রয়ে থেকে, যার খেয়ে-পরে ওদের মানুষ করার প্রয়াস পেয়েছি এবং যিনি সর্বতোভাবে আমাকে স্বাধীনতা দিয়েছেন, তিনি আমার বর্তমান স্বামী সন্তোষ কুমার দাস।'
যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলেও সংগ্রাম শেষ হয়নি উষারানী দেবীর। দীর্ঘ ২৮ বছর পর তিনি অনুভব করেছেন সব কথা সবার সামনে মেলে ধরার তাগিদ। দুঃসহ অতীতকে হৃদয় খুঁড়ে তুলে আনার মধ্যে অনেক জটিলতা থাকা সত্ত্বেও তিনি সাহসের পতাকা তুলে ধরেছেন, পরবর্তী প্রজন্মের জন্য ইতিহাসের সত্য মেলে ধরতে চেয়েছেন। তিনি যে জননী সাহসিকা, মানুষের অবমাননার সব গ্লানি মুছে দেওয়ার জন্য তাঁর সাধনার কোনো সমাপনী রেখা নেই।



