নারী দিবসে আলোচনা: নারী ও কন্যাশিশুর ন্যায়বিচার ও সুরক্ষায় বাংলাদেশের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন
নারী দিবসে আলোচনা: নারী ও কন্যাশিশুর ন্যায়বিচারে বাংলাদেশের প্রস্তুতি

নারী দিবসে আলোচনা: নারী ও কন্যাশিশুর ন্যায়বিচার ও সুরক্ষায় বাংলাদেশের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন

আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে ‘নারী ও কন্যাশিশুর ন্যায় বিচার ও সুরক্ষায় বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রগতি সত্ত্বেও নারী ও কন্যাশিশুর ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো প্রস্তুত নয়। বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, আইনের দুর্বল প্রয়োগ এবং গভীর সামাজিক মানসিকতার কারণে অনেক নারী ন্যায়বিচার পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

আলোচনা সভার প্রেক্ষাপট

আজ সোমবার বেলা ১১টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে এই সভার আয়োজন করে বহ্নিশিখা ও গ্রিন ভয়েস নামের দুটি সংগঠন। ‘আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার, সুরক্ষিত নারী ও কন্যাশিশু অধিকার’ স্লোগানে এবার বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপিত হচ্ছে।

মহিলা পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক উম্মে সালমা বেগম বলেন, ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্য ‘রাইটস, ইকুয়ালিটি অ্যান্ড জাস্টিস’। এই প্রতিপাদ্যে বিশেষভাবে ন্যায়বিচারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, অনেক মামলার রায় পেতে বছরের পর বছর লেগে যায়। ফলে ভুক্তভোগী বা বাদী জীবিত থাকাকালেই অনেক সময় বিচার দেখতে পান না। সে জন্য শুধু আইন বা প্রতিষ্ঠান নয়, সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তনের ওপরও জোর দেন তিনি।

নারী নির্যাতনের উদ্বেগজনক চিত্র

গ্রিন ভয়েসের সহসমন্বয়ক মোনছেফা তৃপ্তি ‘নারী ও কন্যাশিশুর আগামীর ন্যায়বিচার ও সুরক্ষা নিশ্চিতে কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ’ বিষয়ে মূল প্রবন্ধ তুলে ধরেন। তিনি নারীর প্রতি সহিংসতার উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে বলেন, চলতি বছরের তিন মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী পাঁচ শতাধিক নারী ও শিশু ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনা শুধু বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয় বরং নারী ও কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র ও সমাজ কতটা প্রস্তুত—সেই প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে।

দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের চিত্র এখনো উদ্বেগজনক উল্লেখ করে তিনি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও জাতিসংঘের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক সংস্থার (ইউএনএফপিএ) ২০২৫ সালের তথ্য তুলে ধরেন। মোনছেফা তৃপ্তি বলেন, বাংলাদেশের প্রায় ৭৬ শতাংশ নারী জীবনের কোনো না কোনো সময়ে সহিংসতার শিকার হয়েছেন। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনায় দেশে ৭ হাজার ৬৬টি মামলা হয়েছে।

শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারীদের পিছিয়ে থাকা

তাঁর উপস্থাপনায় উঠে আসে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি ব্যবহার ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে এখনো নারীদের পিছিয়ে থাকার দিকটিও। তাতে বলা হয়, ২০২৪ সালের বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে মোট শ্রমশক্তি প্রায় ৭ কোটি ১৭ লাখ। এর মধ্যে নারী শ্রমশক্তি প্রায় ২ কোটি ৩৭ লাখ। তবে আগের বছরের তুলনায় নারী শ্রমশক্তি কমেছে এবং প্রায় ১৬ লাখ নারী শ্রমবাজার থেকে ছিটকে পড়েছেন। আর দেশে প্রায় ২৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ নারী কখনো স্কুলে যাননি। একই সঙ্গে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (এসটিইএম) খাতে নারীর অংশগ্রহণ মাত্র ২১ শতাংশ।

রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা

আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, কমিশনের একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে অনেক ইতিবাচক প্রস্তাব রয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তৃত জন–আলোচনা খুব বেশি হয়নি। বরং কমিশনের সদস্যদের বিরুদ্ধে অবমাননাকর আচরণের ঘটনাও দেখা গেছে। এর মধ্য দিয়ে সমাজের একটি অংশের নারীবিরোধী মনোভাবও স্পষ্ট হয়েছে।

সিপিবির এই নেতা বলেন, নির্বাচনের সময়ও দেখা গেছে কিছু রাজনৈতিক শক্তি নারীর প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ অবস্থান নিয়েছে এবং নারীদের জনজীবন থেকে দূরে রাখার প্রবণতা প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে সমাজের একটি অংশের নারীরাও কখনো কখনো নিজেদের অধিকার বঞ্চনাকে মেনে নিচ্ছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। সে জন্য আইন প্রণয়নের পাশাপাশি সমাজের মানসিকতা ও প্রচলিত চিন্তাধারার পরিবর্তনের ওপর জোর দেন তিনি।

বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও দাবিসমূহ

গ্রিন ভয়েসের উপদেষ্টা ও স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, ‘নারীকে যদি সমাজের শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তাহলে তারা অসাধারণ পরিবর্তন ঘটাতে পারে। কিন্তু বাস্তবে আমরা এখনো নারীকে সেইভাবে গ্রহণ করতে পারিনি।’ সে জন্য অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে নারীর আরও বেশি অংশগ্রহণ নিশ্চিতের আহ্বান জানান তিনি। নারী নির্যাতন ও সহিংসতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বিচারহীনতা উল্লেখ করে এই স্থপতি বলেন, মাত্র ১১ থেকে ১৩ শতাংশ ঘটনার বিচার সম্পন্ন হয়। এটি স্পষ্টভাবে বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি করছে। অপরাধীরা শাস্তি না পেলে অপরাধ আরও বাড়ে—এটাই বাস্তবতা।

আলোচনা অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে গ্রিন ভয়েস ও বহ্নিশিখার প্রতিষ্ঠাতা আলমগীর কবির বলেন, ‘নারী যেন তার জ্ঞান, শক্তি, সাহস ও মনোবল দিয়ে প্রতিদিন মর্যাদার সঙ্গে জীবন যাপন করতে পারে—সেই সমাজ গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত।’ নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন সদস্যদেরও হেয় করার প্রসঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘আমরা কি সত্যিই নারীর মর্যাদা নিশ্চিত করতে পারছি?’

আলোচনা সভায় সংগঠনের পক্ষ থেকে দাবিসমূহ তুলে ধরেন বহ্নিশিখা রংপুর জেলার সমন্বয়ক সুরাইয়া আখতার। এর মধ্যে বিদ্যমান আইন ও বিচারব্যবস্থায় ধর্ষণসহ নারী নির্যাতনের ঘটনায় জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা ও বাস্তবায়ন, সব ধর্ষণ ও সহিংসতার ঘটনা দ্রুত তদন্ত ও দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বা জোরপূর্বক বিয়ের মাধ্যমে নিষ্পত্তি বন্ধ করা, ধর্ষণ মামলায় ভুক্তভোগীর চরিত্রগত সাক্ষ্য নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা, ধর্ষণের ঘটনায় স্থানীয় সালিস, আপস-মীমাংসা ব্যবহার বন্ধ করা, মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী ধর্ষণ আইন সংস্কার করা, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫ দ্রুত আইনে রূপান্তর করা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান, পুলিশ ও বিচার বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।

সভায় শুভেচ্ছো বক্তব্য দেন গ্রিন ভয়েসের সহসমন্বয়ক হুমায়ুন কবির সুমন। বহ্নিশিখার প্রোগ্রাম সমন্বয়ক ফাহমিদা নাজনীনের উপস্থাপনায় আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন গ্রিন ভয়েস বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ শাখার সদস্যসচিব অংকিতা রানী সাহা, তেজগাঁও কলেজ শাখার সভাপতি শাহরিন সেজুতি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার কার্যনির্বাহী সদস্য আর্নিকা চৌধুরী, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি হাফসা তাসনিম ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সদস্য মারজান আফরিন।