রাজনীতিতে নারীর নেতৃত্ব ও সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ সংলাপে নারী প্রার্থীদের কণ্ঠস্বর
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে 'রাজনীতিতে নারীর নেতৃত্ব ও সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ' শীর্ষক সংলাপ ও সম্মাননা অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। একশনএইড বাংলাদেশ ও প্রথম আলোর যৌথ আয়োজনে এই অনুষ্ঠানে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া নারী প্রার্থীরা তাদের অভিজ্ঞতা ও চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরেন।
নির্বাচনী পরিসংখ্যান ও নারীর প্রতিনিধিত্ব
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থীর হার ছিল মাত্র প্রায় ৪ শতাংশ। মোট ৮৫ জন নারী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন মাত্র ৭ জন। আলোচকরা উল্লেখ করেন, নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও নারীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও বিজয়ী হওয়া রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। রাজনীতিসহ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়।
নারী প্রার্থীদের অভিজ্ঞতা ও বক্তব্য
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী রুমিন ফারহানা বলেন, 'রাজনৈতিক দলগুলোর নারীবিদ্বেষ মনোভাবের উদাহরণ এবারের নির্বাচন। যে দল নারীদের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয় না, সেই দলকে নারীরা যাতে ভোট না দেন, সে আহ্বান জানাই।' তিনি আরও যোগ করেন, পরিবারে কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্য না করলে সেই কন্যাশিশু মেরুদণ্ড সোজা করে বাঁচতে পারে।
ফরিদপুর-৩ আসনে বিএনপির বিজয়ী প্রার্থী চৌধুরী নায়াব ইউসুফ বলেন, 'আমি নারী, তাই নমিনেশন পাব কি না, কোনো পুরুষ প্রার্থীকে এ সিট দিয়ে দেওয়া হবে কি না—এসব ভেবে অনেকে তদবির করতে বলেছেন। তবে আমার আত্মবিশ্বাস ছিল। শেষ পর্যন্ত এলাকার ভোটাররা আমাদের ওপর আস্থা রেখেছেন।'
ঢাকা–৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা বলেন, নির্বাচনে কত নারী অংশগ্রহণ করলেন, সেই সংখ্যা শুধু বিবেচনায় না নিয়ে মন্ত্রিসভা, রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্তসহ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় কত নারী আছেন, সে বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি মন্তব্য করেন, অনলাইনে হয়রানির কারণে নারীরা রাজনীতি থেকে পিছিয়ে যান।
সাইবার হয়রানি ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ
ঢাকা–২০ আসনে এনসিপির প্রার্থী নাবিলা তাসনিদ বলেন, নির্বাচনী প্রচার চালানোর সময় তিনি সাইবার হয়রানির শিকার হয়েছেন। পুরুষের তুলনায় নারী প্রার্থীরাই বাড়তি হয়রানির শিকার হন এবং দমিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়। ঢাকা–১০ আসনের প্রার্থী নাসরিন সুলতানা জানান, নির্বাচনে অংশ নিতে গিয়ে তিনি নিজেই অনলাইনে বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন এবং থানায় মামলা করেছেন, কিন্তু সেই মামলার এখনো কোনো সুরাহা হয়নি।
একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, 'নারীর ক্ষমতায়নের প্রথম শর্ত, নারীর জন্য সহিংসতামুক্ত নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা। নারীর প্রতি সহিংসতার ক্ষেত্রে সাইবার বুলিং নতুন উপদ্রব হিসেবে দেখা দিয়েছে।' তিনি আরও উল্লেখ করেন, চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানসহ বিভিন্ন আন্দোলনে নারীরা সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিলেও পরে আর এই নারীদের দেখা যায় না।
সম্মাননা ও বিশেষ অতিথিদের বক্তব্য
অনুষ্ঠানে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির, একশনএইড ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ সোসাইটির চেয়ারম্যান ইব্রাহিম খলিল আল জায়াদ অংশ নেওয়া নারীদের সম্মাননা জানান। সম্মাননাপ্রাপ্ত নারীদের একশনএইড বাংলাদেশের 'হ্যাপি হোম' প্রকল্পের সুবিধাবঞ্চিত মেয়েশিশুদের আঁকা ছবি উপহার দেওয়া হয়।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, 'এবারের নির্বাচনে বিজয়ীরা নারী হিসেবে নয়, সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে জাতীয় সংসদে কথা বলবেন, এটাই সবার প্রত্যাশা। নারীর অধিকার আদায়ে সংসদে পুরুষদেরও কথা বলতে হবে। কেননা নারীরা ভোট না দিলে তাঁরা সংসদে আসতে পারতেন না।'
প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, প্রথম আলো নারীদের বিষয়গুলো সব সময় গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করার চেষ্টা করে। তিনি অ্যাসিড সন্ত্রাস কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে প্রথম আলোর ভূমিকার কথা বলতে গিয়ে উল্লেখ করেন, একসময় বছরে ৫০০–এর বেশি মানুষ অ্যাসিডদগ্ধ হতেন, কিন্তু বর্তমানে এই সংখ্যা কমে বছরে ১০ থেকে ১২ জনে নেমেছে। রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখা উচিত বলে তিনি মনে করেন।
অন্যান্য আলোচনা ও উপস্থিতি
রংপুর–৩ আসনের হিজড়া প্রার্থী আনোয়ারা ইসলাম রানী বলেন, নির্বাচনের পাঁচ দিন আগে তিনি প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন। হিজড়াসহ প্রান্তিক নারীদের সংসদে সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ব্রিটিশ হাইকমিশনের সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাডভাইজার তাহেরা জাবীন, ইউএনডিপি বাংলাদেশের সিনিয়র জেন্ডার অ্যানালিস্ট শারমিন ইসলাম, জাগো ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা করভি রাখসান্দ প্রমুখ।
অনুষ্ঠানের শুরুর দিকে নাট্য সংগঠন পালাকারের সদস্যরা 'চেনা পরবাস' নামের একটি নাটক পরিবেশন করেন। এই সংলাপটি আন্তর্জাতিক নারী দিবস সামনে রেখে আয়োজিত হয়, যা নারীর রাজনৈতিক অধিকার ও সুরক্ষা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার মঞ্চ হিসেবে কাজ করে।
