মুক্তিযুদ্ধের অজানা ইতিহাস: মানিকহাটের কুবাদ ও সাইদের গল্প
অলংকরণ: এস এম রাকিবুর রহমান। মানিকহাটে তখন হাইস্কুল ছিল না। বিদ্যুৎ ছিল না, পাকা রাস্তা ছিল না, সন্ধ্যার পর আলো ছিল না। ছিল শুধু মাঠ, নদী, গাজনার বিল আর মানুষের দীর্ঘশ্বাস। গ্রামের ছেলেমেয়েদের পড়তে হলে যেতে হতো সাতবাড়িয়া। পায়ে হেঁটে দুই ঘণ্টা; বৃষ্টি হলে আরেকটু বেশি। কুবাদ সেই পথ ভালো করে চিনত। সেই পথই যেন তার বেঁচে থাকার একমাত্র ভরসা।
যুদ্ধের ডাক ও গ্রামের মায়া
মাধ্যমিক শেষ করে কলেজে যাওয়ার কথা ছিল কুবাদের। কিন্তু বাড়িতে অন্য হাওয়া। বাবা বললেন, ‘আর পড়াশোনা না। সংসারের হাল ধর।’ মেয়েও দেখা শুরু করেছিল পরিবার। কিন্তু কুবাদের বুকের ভেতরে যে অস্থিরতা; সেটা বিয়ের জন্য না, তার ভাবনা সবার আগে দেশ। ৭ মার্চের ভাষণ তাকে অনুপ্রাণিত করেছিল। কিছুদিন পর দেশে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। সেদিন মানিকহাট থেকে কুবাদ একাই গেল যুদ্ধে। সে বছর তার আর বিয়ে করা হলো না।
পাবনা থেকে নদীপথে, পাংশা, তারপর আবার নৌকায় কুষ্টিয়া। কুষ্টিয়া থেকে পায়ে হেঁটে প্রায় সত্তর মাইল—কলকাতার বর্ডার পার হতে হবে। পথে সঙ্গী জুটল কয়েকজন। কেউ কৃষকের ছেলে, কেউ মাস্টারের ছেলে, একজন ছিল নাপিত। কেউ কাউকে চেনে না, তবু একসাথে হাঁটছে। বর্ডার পার হওয়ার সে রাতে আকাশ মেঘলা। অন্ধকারে পথ চেনা যাচ্ছে না। বিমল কুণ্ডু দলের গাইড, সে বলল চুপ করে থাকতে, একটা কথাও নয়। কুবাদ সেই রাতে বুঝল নিঃশব্দতারও একটা ওজন আছে—সেই ওজন বুকে চেপে বসে, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়।
সাইদের সঙ্গে পরিচয় ও এক করুণ অধ্যায়
ট্রেনিং হলো। অস্ত্র ধরতে শিখল। শিখল মাটিতে শুয়ে থাকতে, ক্ষুধা সহ্য করতে, ঘুমের মধ্যেও কান খোলা রাখতে। তারপর ফিরে এল ১১ নম্বর সেক্টরে। সাইদের সঙ্গে পরিচয় হলো একদিন সন্ধ্যায়। কুবাদ তাকে দেখেই চিনতে পারল—মানিকহাটের ছেলে, এক ক্লাস ছোট। রোগা পাতলা, মুখে সবে গোঁফের রেখা, কিন্তু চোখে একধরনের আলো। সেই রাতে দুজনে অনেকক্ষণ কথা বলল। মানিকহাটের কথা, বিলের কথা, পরিচিত মানুষের কথা।
কথায় কথায় সাইদ একটা নাম বলল, জজ সাহেবের নাম। কুবাদ চমকে উঠল: ‘তুই জজ সাহেবকে চিনিস?’ সাইদ একটু থামল। তারপর বলল: ‘চিনি।’ কিন্তু ঠিক কীভাবে চেনে, সেটা আর বলল না। কুবাদ জিজ্ঞেস করল না। যুদ্ধের মাঝে কিছু প্রশ্ন করতে নেই, উত্তর না জানাটাই কখনো কখনো নিরাপদ।
একদিন মাইন ধ্বংস করতে গিয়ে কুবাদ আঘাত পেল। কয়েক দিনের বিশ্রাম দরকার। সাইদ সেদিন পাহারায় ছিল একা। পরের দিন যা হলো, কুবাদ নিজের চোখে দেখেনি, তবু সারা জীবন অনুভব করতে পারবে। পাকিস্তানি মিলিটারি একা পেয়েছিল সাইদকে। তারা সাইদের চোখ দুটো তুলে নিয়ে গেছে। সাইদ যখন চিৎকার করল, সেই আওয়াজে গাছের পাখি উড়ে গেল দূর আকাশে। সেদিন থেকে কুবাদের ঘুমের মধ্যে একটা শব্দ থাকত। সাইদের সেই চিৎকার।
স্বাধীনতা-পরবর্তী জীবন ও গোপন রহস্য
কয়েক মাস পরেই দেশ স্বাধীন হলো। কুবাদ বাড়ি ফিরে এল। সাইদও ফিরল, তবে দুটো কালো গর্ত নিয়ে, যেখানে একসময় চোখ ছিল। গ্রামের মানুষ তাকে ডাকতে লাগল কানা সাইদ বলে। সাইদ কিছু বলত না। সে হাঁটত, থামত, শুনত। দেখতে পেত না, কিন্তু টের পেত সব। গ্রামের মাটির ঘ্রাণ শুঁকে বুঝতে পারত বাজারের সড়ক কোন দিকে গেছে।
একদিন গ্রামে একটা গুজব রটল। কেউ বলছে, জজ সাহেব নাকি যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি মিলিটারিকে সাহায্য করেছিলেন। গোপনে খবর দিয়েছিলেন। কোথায় মুক্তিযোদ্ধারা আছে, সেই তথ্য পাচার হয়েছিল তাঁর মাধ্যমে। কুবাদ গুজবটা শুনল। সে রাতে সে ঘুমাতে পারল না। লুডু তাকে যে নামগুলো দিয়েছিল সেই রাতে মাঠের ধারে—সেই নামগুলোর কথা মনে পড়ল। কীভাবে জানত লুডু? জজ সাহেব কি সত্যিই...
কুবাদ ভাবনাটা সম্পূর্ণ করল না। মাথার ভেতরে একটা রেখা টেনে বন্ধ করে দিল। কিছু সত্য জানার চেয়ে না জানাই ভালো। কারণ, সত্যটা জানলে লুডুর মুখটা মাথায় আসে; সেই মুখটা কুবাদ ঘেন্না করতে পারে না। লুডু তার সাথে কোনো দিন বিশ্বাসঘাতকতা করেনি। কিন্তু লুডুর বাবা?
স্কুল প্রতিষ্ঠা ও শেষ বয়সের সংগ্রাম
মানিকহাটের স্কুলের কথাটা কুবাদ প্রথম তুলেছিল একদিন বাজারে। সাইদ পাশে ছিল। ‘গ্রামে একটা হাইস্কুল দরকার,’ কুবাদ বলল। ‘ছেলেমেয়েগুলো সাতবাড়িয়া যেতে যেতে ঝরে পড়ছে।’ সাইদ বলল, ‘করতে পারবি?’ ‘পারব।’ অনেক বছর লাগল। টাকা জোগাড় হলো ধীরে ধীরে স্কুলঘর তৈরি হলো। কুবাদ নিজের জমির একটা অংশ দিল। সাইদ দিল তার সামান্য সঞ্চয়। গ্রামের মানুষ এগিয়ে এল—কেউ ইট, কেউ বাঁশ, কেউ শুধু শ্রম। স্কুলটা উঠল।
প্রথম দিন যখন বাচ্চারা এসে ঘরে বসল, কুবাদ বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। ভেতরে ঢোকেনি। সাইদ পাশে দাঁড়িয়ে বলল, ‘ভেতরে যাস না কেন?’ তখন কুবাদের চোখ বেয়ে অশ্রু বেয়ে পড়ল। কুবাদ বলল, ‘একটু পরে।’ সাইদ বুঝতে পেরেছিল তার চোখ ভিজে কণ্ঠ ভারী হয়ে গেছে।
শেষ বয়সে টাকার কষ্ট হলো। রাহেলার শরীর ভালো না, ওষুধ লাগে। ছেলেরা যে যার মতো চলে গেছে—কেউ শহরে, কেউ বিদেশে। বড় ছেলে টাকা পাঠায় মাঝে মাঝে, কিন্তু নিয়মিত না। সংসারের খরচ বাড়তে থাকে, আয় কমে গেছে। কুবাদ কারও কাছে হাত পাতে না। এটা তার স্বভাব না।
গোপন চিঠি ও অমীমাংসিত প্রশ্ন
একদিন একটা চিঠি এল। খামের ওপর কোনো নাম নেই, ঠিকানা নেই। ভেতরে কয়েকটা কথা-হাতের লেখা, কাঁপা কাঁপা। ‘কুবাদ, আমি জানি তুমি অনেক কষ্টে আছ। তোমার স্কুলের জন্য কিছু করতে চেয়েছিলাম। পারিনি। ক্ষমা করো।’ নিচে কোনো স্বাক্ষর বা কারও নাম নেই। কুবাদ চিঠিটা অনেকক্ষণ ধরে রইল। তারপর রাহেলাকে দেখাল। রাহেলা পড়ল। জিজ্ঞেস করল, ‘কে লিখেছে?’ ‘জানি না।’
সেই রাতে সাইদ এল। লাঠিতে ভর দিয়ে, দুজনে বসল উঠোনে। আমগাছের ছায়ায়। ‘কী ভাবছিস?’ ‘একটা চিঠি পেয়েছি।’ ‘কার?’ ‘জানি না।’ সাইদ কিছু বলল না। কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে সামান্য একটু ভাঁজ পড়ল, হাসি কি না বোঝা গেল না। কুবাদ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল, ‘তুই জানিস কে লিখেছে?’ সাইদ বলল, ‘না।’ মিথ্যে বলছে কি না বোঝার উপায় নেই। অন্ধ মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে মিথ্যে কথা ধরা যায় না।
সাইদ হঠাৎ বলল, ‘কুবাদ ভাই, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?’ ‘হ্যাঁ।’ ‘যদি জানতে পারতিস সেদিন আমার চোখের কথা কে জানিয়েছিল মিলিটারিকে, তুই কী করতিস?’ বুকের ভেতরটা একবার কেঁপে উঠল কুবাদের। সে অনেকক্ষণ চুপ থাকল। তারপর বলল, ‘তুই এই প্রশ্নটা আজকে করলি কেন? জানিস না কী করতাম।’ তারপর সাইদ কোনো জবাব দিল না। সে জানে কুবাদের মতো সৎ দেশপ্রেমিক আছে বলেই আমরা বেঁচে থাকার ভরসা পাই।
শেষ অধ্যায় ও চিরন্তন প্রশ্ন
তিন দিন পর সাইদ মারা গেল। খুব ভোরে। ঘুমের মধ্যে। কুবাদ যখন খবর পেল, তখন উঠোনে দাঁড়িয়ে ছিল। পায়ের তলায় শিশিরভেজা মাটি। আকাশে তখনো ভোরের আলো পুরোপুরি ফোটেনি। সে কাঁদল না। শুধু বুক পকেট থেকে চিঠিটা বের করল। ভাঁজ খুলল। একবার পড়ল। তারপর ধীরে ধীরে ছিঁড়ে ফেলল। টুকরোগুলো হাওয়ায় উড়ে গেল—সাদা বকপক্ষীর মতো, হালকা, ভোরের নিয়ন আলোয়। কুবাদ সেদিকে আর তাকাল না। ঘরে ঢুকে গেল। ফিসফিস করে বলে উঠল, লুডুর পরিবার একটা মীরজাফর, দেশদ্রোহী।
