রাজশাহীর প্রথম শহীদ মিনার: রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নেই, নতুন কেন্দ্রীয় মিনার উদ্বোধনহীন
রাজশাহীর প্রথম শহীদ মিনার: স্বীকৃতি নেই, নতুন মিনার উদ্বোধনহীন

রাজশাহীর প্রথম শহীদ মিনার: ইতিহাসের অংশ কিন্তু স্বীকৃতিহীন

মায়ের ভাষা রক্ষায় ১৯৫২ সালে সালাম, রফিক, জব্বার, বরকতসহ আরও অনেকে রাজপথে প্রাণ দিয়েছেন। এই মহান আন্দোলনে রাজশাহীর সর্বস্তরের পেশাজীবী, ছাত্র ও সাধারণ জনতার গৌরবময় ভূমিকা ইতিহাসের পাতায় অমলিন হয়ে আছে। ভাষা আন্দোলনের সময় দেশের প্রথম শহীদ মিনারটি নির্মাণ করা হয়েছিল রাজশাহী কলেজ মুসলিম ছাত্রাবাস এলাকায়। তবে দুঃখের বিষয়, এই ঐতিহাসিক শহীদ মিনারটির আজও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মেলেনি।

নতুন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার: উদ্বোধনহীন কিন্তু প্রস্তুত

প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণস্থল থেকে প্রায় ৩০০ গজ দূরে রাজশাহী কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়েছে। ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আদলে তৈরি এই স্থাপনাটি ইতিমধ্যে স্থানীয়দের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য এটি সম্পূর্ণ প্রস্তুত করা হয়েছে এবং নির্মাণ কাজও শেষ হয়েছে। বর্তমানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ চলছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রথম প্রহরে রাজশাহীবাসী এই শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন।

রাজশাহী মহানগরীর সোনাদিঘি পুকুরের পাশে পুরাতন সার্ভে ইনস্টিটিউটের জায়গায় এক দশমিক এক একর জমির ওপর এই শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়েছে। নির্মাণব্যয় হয়েছে ৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা। বাস্তবায়ন করেছে রাজশাহী জেলা পরিষদ। তবে এই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হচ্ছে না। রাজশাহী জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে ফাতিমা জানান, নির্মাণ কাজ শেষ হয়ে গেছে এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্নও করা হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন না করে রাজশাহীবাসীর জন্য প্রথম প্রহর থেকে উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। প্রচার-প্রচারণার দায়িত্ব জেলা প্রশাসন দেখবে।

নির্মাণ নিয়ে দ্বন্দ্ব ও সমাধান

রাজশাহী মহানগরীতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে অনেক দিন ধরেই আলোচনা চলছিল। তবে এই নির্মাণ কাজ নিয়ে জলঘোলা হয় বেশ। রাজশাহী সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হলে শহীদ মিনারের কার্যক্রম থেমে যায়। রাজশাহী সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ একটি প্রকল্প নিয়ে জেলা পরিষদের জায়গায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলে জেলা পরিষদ তাতে আপত্তি জানায়। পরে মন্ত্রণালয় বিষয়টি সুরাহা করে জেলা পরিষদকে কাজটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে রাজশাহী জেলা পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মীর ইকবাল ২০২৪ সালের ১৮ মে ওই জায়গায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন। এর আগে ২০২০ সালের ১৬ ডিসেম্বর শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তুরের উদ্বোধন করেন প্রয়াত ভাষাসৈনিক গোলাম আরিফ টিপু। ওই দিনই সেখানে মুক্তিযুদ্ধের সব শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। সে সময় উপস্থিত ছিলেন ভাষাসৈনিক আবুল হোসেন, মোশাররফ হোসেন আখুঞ্জিসহ বীর মুক্তিযোদ্ধারা।

১৯৫২ সালের প্রথম শহীদ মিনার: একটি ঐতিহাসিক স্মৃতি

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় হত্যার প্রতিবাদে প্রথম শহীদ মিনার নির্মিত হয় রাজশাহীতে। ওই দিন সন্ধ্যায় রাজশাহী কলেজের নিউ হোস্টেলের একটি কক্ষে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হোস্টেল প্রাঙ্গণে ওই রাতেই একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা হয়। ইট, কাদামাটি ও বাঁশ দিয়ে ‘শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ’ তৈরি করে ছাত্ররা। অদক্ষ হাতে রাত ১২টায় নির্মাণ হলো দেশের প্রথম শহীদ মিনার। পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি সকালে ফুলের শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে ওই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। কয়েক ঘণ্টা পরই তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের পুলিশ সেটি ভেঙে দেয়। এই ঘটনা রাজশাহীর ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।