বিশেষ যন্ত্রপাতি নিয়ে সোনা-রুপা খোঁজেন মিরসরাইয়ের ইউসুফ আলী, দুই দশকে ২০ ভরির বেশি গয়না উদ্ধার
সোনা-রুপা খোঁজেন মিরসরাইয়ের ইউসুফ আলী, দুই দশকের অভিজ্ঞতা

বিশেষ যন্ত্রপাতি নিয়ে সোনা-রুপা খোঁজেন মিরসরাইয়ের ইউসুফ আলী

চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার মধ্যম সোনাপাহাড় বেদেপাড়ার বাসিন্দা ইউসুফ আলী ৪০ বছর বয়সী এক ব্যক্তি, যিনি ২২ বছর ধরে একটি বিচিত্র পেশায় নিয়োজিত। প্রতিদিন সকালে তিনি বিশেষ যন্ত্রপাতি হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন সোনা ও রুপা খোঁজার কাজে। গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে তিনি গেরস্তবাড়িতে পানিতে হারানো সোনার গয়না খুঁজে দেন। কাজ সফল হলে সেদিন তাঁর রোজগার ভালো হয়, যা দিয়ে তিনি চাল, ডাল, তেল, লবণ কিনে নিয়ে যান। তবে কখনো কখনো তাঁকে ফিরতে হয় খালি হাতে, কারণ কাজ মেলে না সব সময়।

বেদে পল্লির জীবন ও পেশার বৈচিত্র্য

মধ্যম সোনাপাহাড় এলাকায় অবস্থিত এই বেদেপাড়াটি ঢাকা-চট্টগ্রাম নতুন মহাসড়কের দুই পাশজুড়ে বিস্তৃত। জোরারগঞ্জ বাজার থেকে পাকা সড়ক ধরে পূর্ব দিকে গেলেই চোখে পড়ে পাড়াটি, যেখানে পাকা রাস্তার দুই পাশে গলিতে সারি সারি টিনশেডের ঘর দেখা যায়। গলির মুখের দোকানগুলোতে অবসরে আড্ডা জমানো মানুষের ভিড় লক্ষণীয়। গলি ধরে এগিয়ে গেলে ঘরের সামনে আলগা চুলায় রান্নায় ব্যস্ত বেদে নারীদের দেখা মেলে, আর শিশুরা গলিতে গলিতে ছোটাছুটি করে খেলাধুলা করে।

এই পাড়ার প্রায় চার হাজার বাসিন্দার মধ্যে নারীদের একটি বড় অংশ দাঁত-কানের পোকা ফেলা ও তন্ত্রমন্ত্রের মাধ্যমে আয় করেন। অন্যদিকে, পুরুষেরা বানর নাচানো, ভাগ্য গণনা এবং সোনা-রুপা খোঁজার কাজে নিয়োজিত। ইউসুফ আলীর মতোই এই পেশায় জড়িত পাড়ার অন্যান্য বাসিন্দাদের মধ্যে রয়েছেন মুক্তার হোসেন, মোহাম্মদ ইমরান, মোহাম্মদ আরাফাত ও মোহাম্মদ মোরশেদ। তাঁদের সবার ঝুলিতেই বিচিত্র অভিজ্ঞতা ও নানা গল্প জমা হয়েছে।

ইউসুফ আলীর কাজের পদ্ধতি ও সাফল্য

ইউসুফ আলী পড়াশোনা করেননি, তবে ২২ বছর আগে তাঁর বাবা নজরুল ইসলামের কাছ থেকে সোনা-রুপা খোঁজার কাজ শিখে তিনি এ পেশায় প্রবেশ করেন। এখন তিনি নিজের উপজেলার গণ্ডি পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কাজ করতে যান। গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে তিনি ডুগডুগি বাজিয়ে উচ্চ স্বরে সোনা-রুপা তালাশের কথা জানান দেন। আওয়াজ শুনে যেসব বাড়ির মানুষের সোনা হারায়, তাঁরা তাঁকে ডেকে নিয়ে যান। হারানো সোনার আনাপ্রতি তিনি ৩০০ টাকা পারিশ্রমিক দাবি করেন।

কাজের পদ্ধতি সম্পর্কে ইউসুফ আলী বলেন, প্রথমে যাঁদের সোনা হারায়, তাঁদের মাধ্যমে সম্ভাব্য জায়গাটি চিহ্নিত করা হয়। এরপর মাঝখানে কাঠের হাতল লাগানো প্লাস্টিকের একটি বিশেষ ঝুড়ি সোনা হারানোর স্থানটির আশপাশে পানির নিচে কাদামাটিতে চেপে ধরা হয়। তারপর কাঠের লাঠির মাথায় লোহার চিরুনি লাগানো বিশেষ যন্ত্র দিয়ে চারদিক থেকে কাদামাটি টেনে এনে ঝুড়িতে জড়ো করা হয়। সেসব কাদামাটি পানিতে ধুয়ে অবশিষ্ট আবর্জনা ওপরে তুলে আনা হয় এবং সে আবর্জনা ঘেঁটে হারানো সোনা খোঁজা হয়। এভাবে পানিতে নেমে একই কায়দায় বারবার হারিয়ে যাওয়া সোনা খোঁজা হয়।

দুই দশকের বেশি সময় ধরে এই কাজ করে ইউসুফ আলী এ পর্যন্ত অন্তত ২০ ভরির বেশি সোনার গয়না খুঁজে দিয়েছেন। একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য হলো, তিন বছর আগে চট্টগ্রামের চকরিয়া উপজেলার মগবাজার এলাকায় এক গৃহস্থের বাড়ির সামনের পুকুর থেকে তিনি এক ভরি ওজনের সোনার চেইন খুঁজে দিয়েছিলেন। মজুরির পাশাপাশি সেখানকার লোকজন খুশি হয়ে তাঁকে পাঁচ হাজার টাকা বকশিশ দিয়েছিলেন। তীব্র শীতেও তিনি কষ্ট সয়ে এই কাজ চালিয়ে যান।

বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও আয়ের অবস্থা

ইউসুফ আলী বলেন, পুকুর ভরাট হওয়ায় মানুষের ঘরের ভেতর গোসল করার প্রবণতা বাড়ছে, ফলে আগের মতো সোনা হারায় না এবং কাজও মেলে না তেমন। এই পরিবর্তনের কারণে তাঁর আয়ের পরিমাণও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। কোনো মাসে তিনি আট হাজার টাকা আয় করেন, আবার কোনো মাসে মাত্র দশ টাকা আয় হয় তাঁর। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘কারও সোনা পানিতে পড়লে আমাদের ডাক পড়ে। গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে কাজ পাই, এখন আবার মোবাইল ফোনেও ডাক আসে। সোনার ভরি যখন আট হাজার টাকা, তখন থেকে এ কাজ করছি।’

মিরসরাইয়ের এই বেদে পল্লিতে ইউসুফ আলীর মতো প্রায় ২০০ জন বাসিন্দা সারা দেশে ঘুরে সোনা-রুপা খোঁজার কাজ করেন, যা তাঁদের আদি পেশা হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে আধুনিকায়ন ও পরিবেশগত পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়ে এই ঐতিহ্যবাহী পেশাটি এখন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন।