নারীর ক্ষমতায়নে 'ইলেকট্রনিক ফ্যামিলি কার্ড' চালু করতে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন
নারীর ক্ষমতায়ন ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে তারেক রহমান ঘোষিত 'রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা' রূপরেখার অন্যতম স্তম্ভ 'ইলেকট্রনিক ফ্যামিলি কার্ড' চালুর উদ্যোগ নিয়েছে নতুন সরকার। ইতোমধ্যে দেশের আটটি বিভাগের আটটি উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে এই কর্মসূচি শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। এই কার্যক্রম পরিচালনার লক্ষ্যে অর্থমন্ত্রীকে সভাপতি করে ১৫ সদস্যের একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এই কমিটি গঠন সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
ফ্যামিলি কার্ড: লক্ষ্য ও সুবিধা
ফ্যামিলি কার্ড কেবল একটি সহায়তা কর্মসূচি নয়; এটি একটি 'সামাজিক চুক্তি' হিসেবে দেখছে সরকার। সরকারের দিক থেকে এটি একটি রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থান। সরকার মনে করছে, এর ফলে নারী যে করুণার বস্তু নয়, উন্নয়নের অংশীদার—সেটি বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে দারিদ্র্য দূর করা মানে যে দান নয়, মানুষের সক্ষমতায় বিনিয়োগ—সেটিও প্রমাণিত হবে।
এই কার্ড দেওয়া হবে পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক নারী সদস্যের নামে। সরকার মনে করে, নারীরাই পরিবারের ব্যয়ের সবচেয়ে দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপক। কার্ডধারী প্রতিটি পরিবার মাসে ২,০০০ থেকে ২,৫০০ টাকা সমমূল্যের খাদ্য সহায়তা (চাল, আটা, ডাল, তেল) অথবা নগদ অর্থ পাবে। লক্ষ্য হলো পর্যায়ক্রমে দেশের সব পরিবারকে এই সুবিধার আওতায় এনে একটি 'সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা' বলয় তৈরি করা।
বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ও চ্যালেঞ্জ
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে মূল দায়িত্ব দিয়ে একটি নীতিমালা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। এই কাজে সহায়তা করবে অর্থ, স্থানীয় সরকার এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়। আগামী সপ্তাহ থেকেই নীতিমালা তৈরির কাজ শুরু হবে বলে সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডি এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও কিছু চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করেছে। সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান জানান, প্রাথমিকভাবে ৫০ লাখ পরিবারকে এই আওতায় আনতে বছরে প্রায় ৯,৬০০ কোটি থেকে ১২,০০০ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। যা জিডিপির প্রায় শূন্য দশমিক ১৫ শতাংশ থেকে শূন্য দশমিক ২০ শতাংশের সমান।
সুবিধাভোগী নির্বাচনে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকতে সিপিডি 'প্রক্সি মিনস টেস্ট' (পিএমটি) পদ্ধতির প্রস্তাব দিয়েছে। এটি একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, যেখানে পরিবারের জীবনযাত্রার মান, বাসস্থানের ধরন এবং সম্পদের মালিকানা যাচাই করে দারিদ্র্যের স্কোর নির্ধারণ করা হয়। সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, "সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। কার্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু আন্তর্জাতিক সূচক রয়েছে, সেটা অনুসরণ করে এবং রাজনৈতিক চাপ উপেক্ষা করে যদি দেওয়া হয় তাহলে প্রকৃত বঞ্চিতরা সুবিধাভোগী হবে।"
নীতিনির্ধারকদের মতামত
সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, "প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা কাজ শুরু করেছি। নীতিমালা চূড়ান্ত হলে বিস্তারিত জানানো হবে।" পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, "বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে ফ্যামিলি কার্ডের বিষয়টি বিস্তারিত উল্লেখ আছে। এটি একটি সর্বজনীন কর্মসূচি। ধাপে ধাপে হতদরিদ্র থেকে মধ্যবিত্ত—সবাইকে এই সুবিধার আওতায় আনা হবে।"
পটুয়াখালী-৪ আসন থেকে বিজয়ী বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য এ বি এম মোশাররফ হোসেন বলেছেন, "বিশ্বের নানা দেশে গবেষণায় প্রমাণিত—নারীর হাতে সরাসরি সহায়তা দিলে তার সুফল শুধু নারীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তা পৌঁছে যায় সন্তানের শিক্ষা, পরিবারের পুষ্টি এবং সামগ্রিক উৎপাদনশীলতায়।"
ঐতিহ্যের আধুনিক রূপ ও অর্থায়ন
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯২-৯৩ সালে বেগম খালেদা জিয়ার সরকার 'খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা' কর্মসূচির মাধ্যমে মেয়েদের স্কুলে ফিরিয়েছিল। বর্তমানের এই 'ফ্যামিলি কার্ড' সেই ঐতিহ্যেরই একটি আধুনিক ও ডিজিটাল সংস্করণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এটি বাস্তবায়নে নিজস্ব রাজস্বের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের কারিগরি সহায়তা নেওয়ার পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে।
