নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও বাজেট: তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দিক
নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও বাজেট: তিনটি দিক

নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং বাংলাদেশের আগামী অর্থবছরের বাজেটের পরিপ্রেক্ষিতে তিনটি বিষয়ের দিকে মনোযোগ দেওয়া দরকার। প্রথমত, নারীর ক্ষমতায়ন বিষয়ে একটি ধারণা; দ্বিতীয়ত, নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের পূর্বশর্ত ও অন্তরায় কী কী এবং বাংলাদেশের আগামী বাজেটে এ ব্যাপারে কী করা যেতে পারে।

ক্ষমতায়নের ধারণা

প্রথম কথা হচ্ছে, কোনো মানুষ অন্য মানুষকে ক্ষমতায়িত করতে পারে না। তার অন্তর্নিহিত ইচ্ছা ও শক্তি এবং একটি সাহসায়নের প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই মানুষ নিজেকে ক্ষমতায়িত করে। বাংলাদেশের নারীদের সংগ্রাম, সহনশীলতা ও পথযাত্রা সেই গতিময়তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। তবে হ্যাঁ, অন্যরা তাদের কর্মকাণ্ড ও সাহায্য–সহযোগিতার মাধ্যমে একজন মানুষের ক্ষমতায়নের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। সে ক্ষেত্রে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র একটি শক্তিশালী সহযোগী শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।

ক্ষমতায়নের মৌলিক অর্থ

দ্বিতীয়ত, ক্ষমতায়ন মানে শুধু উচ্চপদে অধিষ্ঠান কিংবা উচ্চপর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব নয়। এগুলো তাৎপর্যপূর্ণ সন্দেহ নেই, কিন্তু ক্ষমতায়ন ধারণাটির মৌলিক মানে হচ্ছে একজন মানুষের জীবন ও জগতের জন্য যা মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলোকে স্বাধীনভাবে পরিচালনা করা, প্রভাবিত করা এবং নিয়ন্ত্রণ করার পূর্ণ সুযোগ একজন মানুষের আছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ক্ষমতায়নের মাত্রিকতা

তৃতীয়ত, ক্ষমতায়নের নানান মাত্রিকতা আছে। যেমন রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, সাংস্কৃতিক ক্ষমতায়ন। এরা একে অন্যের সঙ্গে সুগ্রথিত এবং এদের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমেই পুরো ক্ষমতায়নের প্রক্রিয়া বেগবান হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের শর্ত

নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের শর্তগুলো কী? প্রথমত, এটি বলার অপেক্ষা রাখে না যে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রথম শর্ত হচ্ছে তাঁর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রের বিস্তার ও প্রসার। সেসব ক্ষেত্রের মধ্যে রয়েছে কর্মে নিয়োজন, উদ্যোগ, আর্থিক সুযোগ ও সেবায় অন্তর্ভুক্তি, সম্পদে অধিকার ও সুযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি সেবায় অভিগম্যতা ইত্যাদি।

এর প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নারীরা বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে নারী বেকারত্বের হার হচ্ছে ১০ শতাংশ, শিক্ষিত মেয়েদের মধ্যে সে হার ২২ শতাংশ। দেশে বর্তমানে ৩ লাখ উচ্চশিক্ষিত মেয়ে বেকার। আমাদের শিল্প খাতে নারীর কর্ম নিয়োজনের হার মাত্র ৩ শতাংশ। কর্মে নিয়োজিত নারীদের ৮১ শতাংশই ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নারীদের অন্তর্ভুক্তির হার মাত্র ৩০ শতাংশ। প্রতি ৪ জনের মধ্যে মাত্র ১ জনের ইন্টারনেট–সুবিধা আছে। সম্পদে মেয়েদের অধিকার বাংলাদেশে বড়ই সীমাবদ্ধ।

সংবাদে প্রকাশিত হয়েছে যে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট পরিস্থিতিতে বিশ্বের ১৮টি দেশে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে এ শিল্পে কর্মে নিয়োজনের ওপর যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, তার মূল অভিঘাত পড়বে মেয়েদের ওপর। কারণ, পোশাকশিল্পের ৮০ শতাংশ শ্রমিকই নারী।

আয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ

দ্বিতীয়ত, এ দেশে মেয়েরা কর্মে নিয়োজিত হতে পারেন, তাঁরা আয় করতে পারেন, কিন্তু সে আয় তাঁদের আয়ত্তে থাকে না এবং সে আয়ের ওপর তাঁদের নিয়ন্ত্রণ নেই। মেয়েদের আয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে বাড়ির বা কাছের পুরুষদের। বিষয়টি মেয়েদের কার্যকর আর্থিক স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে খর্ব করে।

অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ

তৃতীয়ত, ঘরে-বাইরে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের মেয়েদের স্বাধীনতা খুবই সীমাবদ্ধ। নিজের কর্ম নিয়োজনের ক্ষেত্রেও মেয়েদের কখনো দৃশ্যমান এবং কখনো প্রচ্ছন্ন অনুমোদন লাগে পুরুষদের কাছ থেকে। সেই সঙ্গে ঘরের ভেতরে নানান অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও ছেলেরা বহু ক্ষেত্রে এককভাবেই সিদ্ধান্ত নেন এবং সে ব্যাপারে মেয়েদের মতামত নেওয়ারও প্রয়োজন বোধ করেন না। মেয়েদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের পথে এটি একটি বিরাট বাধা।

সুযোগ ও ফলাফলের অসমতা

চতুর্থত, সুযোগ ও ফলাফলের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মধ্যকার অসমতা নারীর ক্ষমতায়নকে বিঘ্নিত করে। এ–জাতীয় বৈষম্যের কারণে বহু ক্ষেত্রে নারীকে আপাতপক্ষে ক্ষমতায়িত মনে হলেও বাস্তবে কার্যত তাঁর ক্ষমতায়ন ঘটে না। এ প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার, আর্থসামাজিক বিভাজনের কারণে বিভিন্ন নারীগোষ্ঠীর মধ্যেও ক্ষমতায়নের হেরফের দেখা যায়। যেমন ধনিক শ্রেণির নারীদের সঙ্গে প্রান্তিক নারীদের, পাহাড়ি নারীদের সঙ্গে সমতলের নারীদের, শিক্ষিত নারীদের সঙ্গে নিরক্ষর নারীদের।

নিরাপত্তা

পঞ্চমত, ঘরে-বাইরে নারীর নিরাপত্তা সুনিশ্চিতকরণ নারীর ক্ষমতায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। সে নিরাপত্তার মধ্যে আছে তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, ঘরে-বাইরে সব রকমের সহিংসতা থেকে নিরাপত্তা, নিপীড়ন থেকে নিরাপত্তা এবং সন্ত্রাস থেকে নিরাপত্তা। তাঁর নিরাপত্তা বিধান করতে হবে জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাব থেকেও। সর্বোপরি নারীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না করলে তাঁর অন্যান্য সুরক্ষাও অর্থহীন হয়ে পড়ে।

অন্তরায়সমূহ

এসব শর্তের পরিপ্রেক্ষিতে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের অন্তরায়গুলোও চিহ্নিত হওয়া প্রয়োজন। এসব অন্তরায়ের শীর্ষে রয়েছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এবং বর্তমানের বিষাক্ত পুরুষতান্ত্রিকতা। নারীর বিরুদ্ধে পুরুষের দুর্বৃত্তায়ন নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের পথে অন্যতম অন্তরায়। প্রথমত, পুরুষশাসিত সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধ নারীর ক্ষমতায়ন চায় না পুরুষের একক নিরঙ্কুশ ক্ষমতাকে নিশ্চিত করতে।

দ্বিতীয়ত, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন বিষয়ে রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল ও প্রক্রিয়ার নানান অঙ্গীকার আছে, কিন্তু তার বাস্তবায়ন নেই। সাম্প্রতিক কালের সংসদ নির্বাচন, উল্লেখযোগ্য হারে সে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় নারী প্রার্থী বিষয়ে দলগুলোর অঙ্গীকার লঙ্ঘনই কাঙ্ক্ষিত বাস্তবায়নের অনুপস্থিতির সবচেয়ে বড় প্রমাণ। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে অঙ্গীকার লঙ্ঘনের মতো তাঁদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক সংকট ও নাজুকতা যে নারীর ওপর একটি অসম অভিঘাতের জন্ম দেয়, সে ব্যাপারে নীতিনির্ধারকদের উপলব্ধি ও সংবেদনশীলতার অভাব দেখা যায়। এ–জাতীয় উপলব্ধি ও সংবেদনশীলতার অনুপস্থিতি সংকটকালে নারীর ক্ষমতায়নের ভঙ্গুরতাকে আরও প্রকট করে তোলে। যেমন বর্তমান জ্বালানিসংকটকালে জ্বালানির ঘাটতি এবং জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিজনিত মূল্যস্ফীতিতে গৃহস্থালির নাজুকতাকে সামাল কে দেবেন? একজন নারী। সংবাদে প্রকাশিত হয়েছে যে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট পরিস্থিতিতে বিশ্বের ১৮টি দেশে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে এ শিল্পে কর্মে নিয়োজনের ওপর যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, তার মূল অভিঘাত পড়বে মেয়েদের ওপর। কারণ, পোশাকশিল্পের ৮০ শতাংশ শ্রমিকই নারী।

বাজেটে করণীয়

বাংলাদেশের আগামী বাজেটে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য কোন কোন দিকে নজর দিতে হবে? তিনটি কথা শুরুতেই বলে নেওয়া ভালো।

এক. একটি বৈশ্বিক ও দেশজ সংকটকালে বাংলাদেশের আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রণীত হচ্ছে। সুতরাং আগামী বাজেট তৈরি হচ্ছে নানান চাপের মুখে। সেসব চাপের পরিপ্রেক্ষিতে নারীস্বার্থ যাতে বলি না হয়, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। দুই. অঙ্গীকার এক কথা, আর অগ্রাধিকার ভিন্ন বিষয়। নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের পক্ষে শুধু অঙ্গীকার করলেই হবে না, সে বিষয়কে বাজেটে অগ্রাধিকারও দিতে হবে। তিন. যেসব বিষয়কে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের পূর্বশর্ত বা অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, সেগুলোর জন্য সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা বাজেটে থাকতে হবে।

নারীর কর্মে নিয়োজন, উদ্যোগ, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং তথ্যপ্রযুক্তি সেবায় নারীর অভিগম্যতা বৃদ্ধির জন্য বাজেটে সুস্পষ্ট সুপারিশ থাকতে হবে। সে ব্যাপারে প্রণোদনামূলক নীতিমালা দরকার। যেমন ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষায়িত ঋণ, উৎপাদন উপকরণের লভ্যতা ইত্যাদি। মেয়েদের গৃহস্থালির সেবামূলক কাজের ক্ষেত্রে বাজেট যদি আর্থিক প্রণোদনা দিতে পারে, তাহলে নানান অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারী আরও অধিক হারে অংশগ্রহণ করতে পারেন।

সেই সঙ্গে মেয়েদের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, বিশেষত তাঁদের প্রজননস্বাস্থ্যের সপক্ষে অর্থ বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন। সে বরাদ্দ যেন দক্ষতার সঙ্গে সময়মতো ব্যয়িত হয়, সেটি নিশ্চিত করা অত্যন্ত প্রয়োজন। মেয়েদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য তাঁদের সক্ষমতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।