যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় পিএইচডি শিক্ষার্থী ছিলেন নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি ও জামিল আহমেদ লিমন। তাদের মর্মান্তিক ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ কয়েকটি ভাইরাল পোস্ট দেখেছি। যেসবের মূলকথা, ‘বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা নতুন দেশে গেলে তাদের উচিত বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যেই থাকা।’ এমনকি কেউ কেউ আমাকেও এটা মনে করিয়ে দিয়েছেন। আবার প্রায়ই বিভিন্ন স্টুডেন্ট ফোরামে দেখি, বাসা শেয়ার করার পোস্টে স্পষ্ট করে লেখা থাকে—একই ধর্ম, একই জাতিগত পরিচয়, একই ভাষার মানুষের সঙ্গে থাকতে পারবেন, এমন বাসা খুঁজছে মানুষ। তাই সব মিলিয়ে একজন ‘ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট’ হিসেবে বিষয়টি নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতাটি ভাগাভাগি করতে ইচ্ছে হলো।
আমার অভিজ্ঞতা
আমি এমফিলের সময় দুই বছর অস্ট্রেলিয়ায় থাকলেও কুইন্সল্যান্ডে কখনো যাওয়া হয়নি। পিএইচডির জন্য যখন গ্রিফিথ ইউনিভার্সিটিতে—কুইন্সল্যান্ড স্টেটের গোল্ডকোস্ট শহরে অফার পেলাম—তখন প্রথম চিন্তা ছিল, কোথায় থাকব?
গোল্ডকোস্ট ট্যুরিস্ট এলাকা, ভাড়া অনেক বেশি আর শিক্ষার্থীদের জন্য অপশনও সীমিত। পরিকল্পনা ছিল, কয়েক দিন এয়ারবিএনবিতে থেকে বাসা খুঁজব। ঠিক তখনই একজন বাংলাদেশি পরিচিত ভাই খুব আন্তরিকভাবে বললেন, আমি যেন তাঁর বাসায় উঠি, তারপর বাসা খুঁজি। তাঁর কথায় নিশ্চিন্ত হলাম। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ায় আসার সময় যত ঘনিয়ে এল, উনি ধীরে ধীরে যোগাযোগ বন্ধ করে দিলেন। ফোন ধরেন না, মেসেজের উত্তর নেই। তখনো ভাবছি, হয়তো ব্যস্ত আছেন।
মেলবোর্নে পৌঁছানোর পরদিনই আমার গোল্ডকোস্ট ফ্লাইট। তখনো তাঁকে পাচ্ছি না। শেষমেশ অনেক চেষ্টা করে যোগাযোগ করতে পারলাম। তিনি জানালেন, তিনি ‘একটা ঝামেলায়’ আছেন, আমি যেন এয়ারবিএনবি দেখি। আমার হাতে তখন ২৪ ঘণ্টা সময়ও নেই, রাত ১০টায় আমার ফ্লাইট ল্যান্ড করবে, আর আমি হন্যে হয়ে তখন এয়ারবিএনবি খুঁজছি।
এ পরিস্থিতি আমার কাছে যতটা না খারাপ লেগেছিল, তার চেয়ে বেশি খারাপ লেগেছিল এই অনুভূতিটি—যে মানুষটি নিজে থেকে আশ্বাস দিয়েছিলেন, তিনি যে কথা রাখতে পারছেন না, তা বিন্দুমাত্র জানানোর প্রয়োজনও মনে করলেন না! পরে বুঝেছি যে ‘ঝামেলায়’ তিনি ছিলেন, তা তাঁর অনেক আগের পরিকল্পনায় ছিল। তিনি যেহেতু জানতেনই অন্তত সময় থাকতে জানালে আমি নিজেকে প্রস্তুত করতে পারতাম। তারপর বাসা পাওয়ার আগপর্যন্ত আমি কী কী ঘটনার মধ্য দিয়ে গেছি, সে গল্প তোলা থাক।
বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচল
এটাও সত্য যে আমি ছাড়াও অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরই নিজের কমিউনিটি নিয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে। যাহোক, এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমি কি এসব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সব বাংলাদেশিকে অবিশ্বাস করব? না, একদমই না।
আমার বিএইচপিআই/সিআরপি কমিউনিটিতে অসাধারণ মানুষ আছেন, যাঁরা আমাকে নিজের মানুষের মতোই আগলে রেখেছেন। সিআরপি কমিউনিটির বাইরেও কাছের মানুষজন আছেন, যাঁদের ওপর নিশ্চিন্তে ভরসা করা যায়। আবার আমাকে ‘আশ্বাস’ দেওয়া মানুষটার মতো মানুষের সংখ্যাও কম না।
প্রশ্ন হতে পারে, অন্য কমিউনিটিতেও কি সব ভালো? না। আমি নিজেও একটা বাসা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছি। কারণ, আমি বর্ণবাদের শিকার হয়েছিলাম আমার সাউথ আফ্রিকান হেরিটেজের অজি বাড়িওয়ালার কাছে।
অস্ট্রেলিয়ার গ্রিফিথ ইউনিভার্সিটির বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী আরিফা জাহান ইমা।
তাহলে আসল কথাটা কী
নতুন দেশে গেলে আমরা স্বাভাবিকভাবেই পরিচিত মানুষ, পরিচিত খাবার, পরিচিত পরিবেশ খুঁজি। এটা আমাদের ‘কমফোর্ট জোন’। কিন্তু একটা জিনিস জানা জরুরি যে ‘কমফোর্ট’ আর ‘সেফটি’ এক নয়।
পরিচিত কমিউনিটি সাপোর্ট দিতে পারে, কিন্তু সেটাকে বাধ্যবাধকতা বানিয়ে ফেলাটা ঠিক নয়। আবার ভিন্ন পরিচয়ের মানুষ মানেই ঝুঁকি, সেটাও সত্য না। ধর্ম, জাতি, জাতীয়তা বা জীবনধারা—এসবের কোনোটাই একা একজনকে ভালো বা খারাপ বানায় না।
মানুষকে চেনা যায় তার চরিত্র দিয়ে। সে কীভাবে কথা বলে, কেমন আচরণ করে, দ্বন্দ্ব হলে কীভাবে সামলায়, সীমারেখাকে সম্মান করে কি না—এসবই আসল।
হ্যাঁ, একই মানসিকতার মানুষ দরকার। শান্তির জন্য, বোঝাপড়ার জন্য দরকার। প্রতিদিনের ছোটখাটো বিষয় নিয়ে অপ্রয়োজনীয় ঝামেলা এড়ানোর জন্য দরকার। কিন্তু যখন আমরা এই চাওয়াগুলোকে কঠোর শর্তে পরিণত করি, তখনই সমস্যাটা শুরু হয়।
তাই হয়তো সমাধানটা খুব জটিল কিছু নয়। ‘লেবেল’ দিয়ে মানুষ বাছার চেয়ে মানুষটাকে বোঝার চেষ্টা করা বেশি জরুরি। নিজের সীমা আর প্রত্যাশা পরিষ্কার করা জরুরি। কারণ, নিরাপত্তা যেমন হাওয়া থেকে আসে না, বিপদও কখনো পরিচয় দেখে আসে না।
বিদেশে জীবনটা এমনিতেই কঠিন। এখানে টিকে থাকা অনেকটাই নির্ভর করে আমরা কাদের সঙ্গে আছি, তার ওপর, কিন্তু তার থেকেও বেশি নির্ভর করে আমরা কাদের বিশ্বাস করছি, তার ওপর। আর বিশ্বাসটা একই পরিচয় দিয়ে তৈরি হয় না; তৈরি হয় ছোট ছোট আচরণ, দায়বদ্ধতা আর পারস্পরিক সম্মানের ওপর ভিত্তি করে। তা না করে এসব লেবেলের অপ্রয়োজনীয় দেয়াল তুলে হয়তো আমরা সেটাকে আরও কঠিন করে ফেলছি।
যেসব প্রশ্ন বেশি গুরুত্বপূর্ণ
লিমন কিন্তু হাউজিং কমিটিকে অভিযোগ জানিয়েছিলেন। এখানেই আমাদের থেমে ভাবা উচিত ছিল। প্রশ্ন হওয়া উচিত ছিল, কেন তাঁর অভিযোগকে জরুরি হিসেবে দেখা হলো না? কেন তাঁকে অন্তত সাময়িকভাবে হলেও নিরাপদ কোনো জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হলো না? একটি অভিযোগ কতটা ‘গুরুত্বপূর্ণ’ হলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, এই মানদণ্ড সঠিকভাবে জানানো প্রয়োজন ছিল।
আরও বড় প্রশ্ন, হিশামের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ থাকার পরও সে কীভাবে এত সহজে বাসা ভাড়া পেল? যে দেশগুলোয় একটি রুম ভাড়া নিতেও অসংখ্য ডকুমেন্ট, ভেরিফিকেশন, ব্যাকগ্রাউন্ড চেক লাগে, সেখানে এই ফাঁকগুলো তৈরি হলো কীভাবে? এ প্রশ্নগুলোই আমাদের আলোচনার কেন্দ্রে থাকার কথা ছিল।
মানুষ কোথায় থাকবে, কার সঙ্গে থাকবে, সেটা তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। কিন্তু সে নিরাপদ থাকবে কি না, সেটা একটি সিস্টেমের দায়িত্ব। আর যদি সেই সিস্টেমই ব্যর্থ হয়, তাহলে আমাদের প্রশ্নও সেখানেই হওয়া উচিত।
কিন্তু আমরা সেসব এড়িয়ে গিয়ে আলোচনা ঘুরিয়ে নিচ্ছি অন্য দিকে। ‘লিমন কেন বাংলাদেশি কমিউনিটিতে থাকল না’, ‘ভবিষ্যতে সবাইকে কেন “নিজেদের মধ্যেই” থাকতে হবে’—এসব এমনভাবে ভাবছি যেন সমস্যার মূলটা ব্যক্তির পছন্দে, সিস্টেমের ব্যর্থতায় নয়।
এই দৃষ্টিভঙ্গিটাই বিপজ্জনক। কারণ, এতে দায় সরে যায় তাদের কাছ থেকে, যাদের দায়িত্ব ছিল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলা সহজ। কিন্তু কাঠামোগত ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা অস্বস্তিকর। আর আমরা বারবার সহজ পথটাই বেছে নিচ্ছি। মানুষ কোথায় থাকবে, কার সঙ্গে থাকবে, সেটা তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। কিন্তু সে নিরাপদ থাকবে কি না, সেটা একটি সিস্টেমের দায়িত্ব। আর যদি সেই সিস্টেমই ব্যর্থ হয়, তাহলে আমাদের প্রশ্নও সেখানেই হওয়া উচিত।



