ব্যস্ত সড়কের ওপর পড়ে ছিল একটি নিথর দেহ। চারপাশ দিয়ে দ্রুতগতিতে ছুটে যাচ্ছিল ট্রাক, মোটরসাইকেল ও অটোরিকশা। মানুষের জীবন চলছিল তার নিজস্ব স্বাভাবিক গতিতে। কিন্তু আচমকাই থমকে গিয়েছিল একদল অবলা প্রাণী। রাস্তার ডিভাইডারের ওপর রক্তাক্ত ও মৃত সঙ্গীটিকে ঘিরে দেড় ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল পুরো ভেড়ার পাল। কেউ সামনে এগোয়নি, কেউ ভয় পেয়ে দূরে সরে যায়নি। নিঃশব্দে তারা অপলক তাকিয়ে ছিল নিথর সঙ্গীটির দিকে। যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না যার সঙ্গে কিছুক্ষণ আগেও পাশাপাশি হেঁটেছে, সে আর কোনোদিন উঠবে না।
ঘটনার বিবরণ
সম্প্রতি ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার মুন্সীরহাট এলাকায় দেখা মিলেছে এমনই এক হৃদয়স্পর্শী ও আবেগঘন দৃশ্যের, যা মুহূর্তেই নাড়িয়ে দিয়েছে পথচারী, স্থানীয় বাসিন্দা ও সড়কে চলাচলকারী সাধারণ মানুষদেরও। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রতিদিনের মতো খামারি মো. ফরিদের ভেড়ার পালটি একসঙ্গে মাঠে চারণের উদ্দেশ্যে বের হয়েছিল। মুন্সীরহাট এলাকায় রাস্তা পার হওয়ার সময় হঠাৎ একটি দ্রুতগামী অজ্ঞাত যান একটি ভেড়াকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে চলে যায়। চাকার পিষ্টে মুহূর্তেই সড়কের ওপর লুটিয়ে পড়ে প্রাণীটি এবং ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
অবলা প্রাণীদের অসাধারণ প্রতিক্রিয়া
সাধারণত সড়ক দুর্ঘটনার মতো পরিস্থিতিতে অবলা প্রাণীরা আতঙ্কে চারদিকে ছুটে পালিয়ে যায়। কিন্তু এবার ঘটল উল্টো ঘটনা। মৃত ভেড়াটিকে ঘিরে ডিভাইডারে জড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে বাকি ভেড়াগুলো। কেউ রাস্তা ছাড়েনি। কেউ দূরে সরে যায়নি। যেন নিথর হয়ে পড়ে থাকা সঙ্গীটিকে একা রেখে যেতে তাদের মন সায় দিচ্ছিল না। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় দোকানি মো. মোস্তাক আলী বলেন, ‘গাড়ির ধাক্কায় ভেড়াটা মারা যাওয়ার পর আমি ভেবেছিলাম বাকি ভেড়াগুলো ভয় পেয়ে পালিয়ে যাবে। কিন্তু ওরা একটুও সরেনি। রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে শুধু মৃত ভেড়াটার দিকেই তাকিয়ে ছিল। দৃশ্যটা দেখে বুকটা কেঁপে উঠেছিল।’
পথচারী সুজন মিয়া সেই মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে বলেন, সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা কয়েকজন মিলে লাঠি উঁচিয়ে ও শব্দ করে ভেড়াগুলোকে সরানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু ওরা কিছুতেই নড়েনি। মনে হচ্ছিল, ওরা বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে তাদের সঙ্গী আর কোনোদিন হেঁটে ওদের সাথে যাবে না। প্রায় দেড় ঘণ্টা একই জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল ভেড়ার পালটি। এ সময় সড়কে যান চলাচলেও কিছুটা বিঘ্ন ঘটে। কিন্তু কেউ তাদের ওপর বিরক্ত হয়নি। বরং অনেকেই দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখেছেন।
খামারির আবেগঘন প্রতিক্রিয়া
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন ভেড়ার মালিক মো. ফরিদ। তিনি যখন নিজের হাতে মৃত ভেড়াটিকে রাস্তা থেকে সরিয়ে নেন, তখনই কেবল বাকি ভেড়াগুলো ধীরে ধীরে রাস্তা ছাড়ে। দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে ভেড়া পালনের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন খামারি ফরিদ আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ‘মানুষ মনে করে এরা অবলা প্রাণী, এদের বুদ্ধি বা আবেগ নেই। কিন্তু এদের ভেতরের টান মানুষের চেয়ে কোনো অংশে কম না। ভেড়ারা সবসময় দলবদ্ধ হয়ে চলে। দলের কেউ বিপদে পড়লে এরা সহজে তাকে ছেড়ে যায় না। আজকেও ওরা সঙ্গীর মৃত্যুটা মেনে নিতে পারছিল না। আমি এসে যখন মৃত ভেড়াটাকে সরিয়ে নিলাম, তখন ওরা হয়তো ভাবল সঙ্গী আমার হেফাজতে আছে। এরপরই ওরা শান্ত হয়ে আমার সঙ্গে রাস্তা থেকে সরে আসে।’
বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা
এই বিষয়ে ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের প্রাণীবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক প্রাণীবিদ ডালিম কুমার রয় বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়ে জানান, পশু-পাখিদের এমন আচরণ মানুষের কাছে অদ্ভুত মনে হলেও এটি তাদের এক ধরনের আদিম ও শক্তিশালী সামাজিক বন্ধন। হাতি, তিমি, শিম্পাঞ্জি কিংবা কুকুরের মতো গৃহপালিত স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে শোক প্রকাশের তীব্র অনুভূতি থাকে। তিনি আরও বলেন, দলবদ্ধ প্রাণীরা যখন তাদের কোনো সঙ্গীকে হঠাৎ হারিয়ে ফেলে, তখন তারা এক ধরনের মানসিক ধাক্কা বা ‘গ্রিফ’ (Grief) এর মধ্য দিয়ে যায়। ভেড়াদের ক্ষেত্রে এই ‘হার্ড মেন্টালিটি’ (Herd Mentality) বা দলবদ্ধতা অত্যন্ত তীব্র। তারা বিপদের মুহূর্তে বা শোকে বিচ্ছিন্ন না হয়ে আরো বেশি একত্রিত হয়, মুন্সীরহাটের এই ঘটনাটি যার এক জীবন্ত ও অনন্য উদাহরণ।



