কাঁঠালের গল্প: অবহেলিত ফল থেকে সম্ভাবনার প্রতীক
কাঁঠালের গল্প: অবহেলিত ফল থেকে সম্ভাবনার প্রতীক

বাংলাদেশে কাঁঠাল উৎপাদনে বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে থাকলেও রপ্তানিতে অনেক পিছিয়ে। সম্প্রতি চীন বাংলাদেশ থেকে কাঁঠাল আমদানিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে, যা এই ফলের রপ্তানি সম্ভাবনা বাড়িয়েছে। কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে এক অনুষ্ঠানে ফল মেলা উদ্বোধন করে কাঁঠালের গুণগান গেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘কাঁঠাল দিয়ে কাবাব তৈরি হচ্ছে, চপ তৈরি হচ্ছে, পাকোড়া তৈরি হচ্ছে। এটা সত্যি প্রশংসনীয়। কাঁঠালের কাবাব বা কাঁঠালের সবজি ফুড ভ্যালুতে (পুষ্টিগুণে) কিন্তু অনেক হাই (উচ্চ)।’ তিনি আরও জানান, বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশ বাংলাদেশ থেকে কাঁঠাল নিয়ে পণ্য তৈরি করতে চায়।

কাঁঠালের পুষ্টিগুণ ও গুরুত্ব

পুষ্টিবঞ্চিত বাংলাদেশের কৃষিজীবী ও দরিদ্র মানুষের একটি বড় অংশ গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালের তিন–চার মাস কাঁঠাল থেকে পুষ্টির চাহিদা মেটায়। প্রতি ১০০ গ্রাম পাকা কাঁঠালে প্রায় ১ দশমিক ৭ গ্রাম প্রোটিন রয়েছে, যা দেশি ফলের মধ্যে তুলনামূলক বেশি। এতে ভিটামিন সি, ভিটামিন বি-৬, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও খাদ্য আঁশ রয়েছে। কাঁঠালের বিচিতে প্রোটিন আরও বেশি, যা গ্রামীণ পরিবারে মাছ-মাংসের অভাব পূরণ করে। পুষ্টিবিদদের মতে, কাঁঠাল শক্তিদায়ক, আঁশসমৃদ্ধ ও কম চর্বিযুক্ত ফল।

উৎপাদন ও রপ্তানি পরিস্থিতি

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে কাঁঠাল উৎপাদনে শীর্ষে ভারত, যেখানে বার্ষিক উৎপাদন ২০ লাখ মেট্রিক টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়েছে ১৮ লাখ ৩০ হাজার ১৩১ মেট্রিক টন কাঁঠাল। ‘কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষ গ্রন্থ ২০২৫’ অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বিভাগেই উৎপাদন হয়েছে প্রায় দুই লাখ টন। তবে রপ্তানিতে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে—২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভারত রপ্তানি করেছে ২৬ হাজার ৬৬০ মেট্রিক টন, যেখানে বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে মাত্র ২ হাজার ৮১ মেট্রিক টন। অথচ থাইল্যান্ড বছরে প্রায় ৭৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাঁঠাল ও কাঁঠালজাত পণ্য রপ্তানি করে, কারণ তারা চিপস, হিমায়িত কোয়া, ভেজিটেবল মিট, ক্যানজাত পণ্য ইত্যাদি প্রক্রিয়াজাত করে বিক্রি করে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কাঁঠালের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থান

শহুরে মধ্যবিত্তের মধ্যে কাঁঠালের প্রতি অনীহা দেখা যায়। অনেকেই কাঁঠালের তীব্র ঘ্রাণ ও খাওয়ার জটিলতার কারণে এটি এড়িয়ে চলেন। অথচ গ্রামীণ জনপদে কাঁচা কাঁঠালের এঁচড়ের ঘন্ট, পাকা কাঁঠালের মুড়িমাখা, কাঁঠালের বড়া ও পিঠা জনপ্রিয়। কাঁঠালের বিচি দিয়ে ভর্তা, তরকারি ও মাংসের সঙ্গেও রান্না হয়। সবকিছুর পর ভুতি গবাদিপশুর খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ কাঁঠালের কিছুই ফেলনা নয়।

আন্তর্জাতিক প্রসঙ্গ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

শ্রীলঙ্কায় ২০২২-২৩ সালের অর্থনৈতিক মন্দার সময় হাজারো মানুষ কাঁঠাল খেয়ে জীবন বাঁচিয়েছেন। ২০২৩ সালের ৮ জুলাই বিবিসির এক প্রতিবেদনে নিতিন শ্রীবাস্তব ও সুনেথ পেরেরা জানান, চরম আর্থিক দুর্দশায় মানুষ রুটি কিনতে না পেরে কাঁঠাল খেয়েছেন। বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষও একইভাবে ক্ষুধা ঠেকাতে কাঁঠালের ওপর নির্ভর করে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় বাংলাদেশ থেকে কাঁঠাল রপ্তানির বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রেও কাঁঠালের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কাঁঠালের বহুমুখী ব্যবহার না বাড়ায় রপ্তানি বাড়ছে না। চিপস, আচার, জেলিসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরি করতে পারলে রপ্তানি সম্ভাবনা বাড়বে।