বেইজিংয়ের ব্যস্ত রাস্তার পাশে এক রহস্যময় সাদা দেওয়াল। কালো পোশাকের রক্ষীদের নজর এড়িয়ে সরু পাথুরে পথ ধরে এগোলেই যেন সম্রাটদের আমলের গোপন বিনোদনকেন্দ্রে পৌঁছানো যায়। কুয়াশাচ্ছন্ন সেই পথে স্বাগত জানান রাজকীয় পোশাকে সজ্জিত এক নারী। এই ঠিকানার নাম ‘কিংস জয়’।
বিশ্বসেরা রেস্তোরাঁ
বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক লামা টেম্পলের বিপরীতে অবস্থিত এই রেস্তোরাঁটি বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সেরা রেস্তোরাঁ। বিশ্বের একমাত্র চীনা রেস্তোরাঁ হিসেবে এটি একই সঙ্গে তিনটি ‘মিশেলিন স্টার’ এবং টেকসই চর্চার জন্য ‘মিশেলিন গ্রিন স্টার’ অর্জন করেছে। তবে এই রাজকীয় নিরামিষাশী স্বর্গে একটি অদ্ভুত নিষেধাজ্ঞা জারি আছে: এখানে চীনের সরকারি কর্মকর্তাদের প্রবেশ নিষেধ!
নিষেধাজ্ঞার কারণ
গত বছর থেকে চীনা কর্মকর্তাদের এই রেস্তোরাঁয় খাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে দেশটির সরকার। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, এই তালিকার কথা প্রকাশ্যে জানানো হয়নি এবং এর কোনও আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা নেই। তবে মূল কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে এর আকাশছোঁয়া খরচ। কিংস জয়-এ জনপ্রতি খাবারের দাম শুরু হয় ২৫০ ডলার (প্রায় ৩০ হাজার টাকা) থেকে। বেইজিংয়ে একজন সরকারি কর্মীর গড় মাসিক বেতন যেখানে ১ হাজার ৬০০ ডলার, সেখানে এক বেলা খাবারে এত খরচ দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের সরাসরি পরিপন্থি। প্রেসিডেন্ট শি শুরু থেকেই সরকারি কর্মকর্তাদের বিলাসবহুল ভোজ ও অতিরিক্ত মদ্যপানের বিরোধী। ২০১৩ সালে তাকে সাধারণ মানুষের মতো লাইনে দাঁড়িয়ে বনের অর্ডার দিতে দেখা গিয়েছিল, যাতে সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার নৈকট্য প্রকাশ পায়। কর্মকর্তাদের এই বিলাসবহুল জীবন যাপনকে কমিউনিস্ট পার্টির ‘নৈতিক অবক্ষয়’ হিসেবে দেখেন তিনি।
অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য
রেস্তোরাঁটির ইন্টেরিয়র যেন কোনও ধ্যানের জগত। চকচকে কালো মার্বেল মেঝেটি অনেকটা গভীর হ্রদের মতো মনে হয়, যার ঠিক মাঝখানে বসে এক বাদক হার্প বাজান। সিল্কের ঝাড়বাতি আর মোমবাতির মৃদু আলোয় সেখানে পরিবেশিত হয় খাঁটি চীনা উপাদানে তৈরি নিরামিষ সব পদ। বাঁশের মজ্জার স্যুপ থেকে শুরু করে ব্ল্যাক ট্রাফল দিয়ে মাঞ্চুরিয়ান রাইস সিল্ক; সবই তৈরি হয় সাধারণ রান্নার কৌশলে, কিন্তু পরিবেশন করা হয় রাজকীয় ভঙ্গিতে।
ইতিহাস ও জনপ্রিয়তা
২০১০ সালে ডেভিড ইন এটি প্রতিষ্ঠা করেন, বর্তমানে তার ছেলে গ্যারি ইন এর প্রধান শেফ। ইন পরিবারের আদি নিবাস বেইজিংয়ে হলেও তারা দীর্ঘদিন তাইওয়ান ও কানাডায় ছিলেন। রুপার্ট মারডক থেকে শুরু করে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বা ইতালির প্রেসিডেন্ট সার্জিও মাতারেল্লা, রাষ্ট্রীয় সফরে এসে অনেকেই এখানে খেয়েছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক প্রতিনিধি বার্নহার্ড শোয়ার্টল্যান্ডার এই রেস্তোরাঁকে সৌন্দর্যের ‘মরুদ্যান’ বলে অভিহিত করেছেন। শেফ গ্যারি ইন মনে করেন, নিরামিষ খাবার কেবল বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের জন্য নয়, এটি উচ্চবিত্তদের কাছেও গ্রহণযোগ্য হতে পারে। তিনি বলেন, আমরা এই উচ্চমানের খাবার বেছে নিয়েছি কারণ প্রভাবশালী মানুষরা যদি নিরামিষের গুরুত্ব বোঝেন, তবে তা প্রাণীকল্যাণ ও জৈব কৃষির প্রসারে সহায়ক হবে।
সরকারি কর্মকর্তাদের নিষেধাজ্ঞার গুঞ্জন সম্পর্কে শেফ গ্যারি বলেন, তিনি বিষয়টি শুনেছেন কিন্তু এর কোনও প্রমাণ পাননি। তবে কর্মকর্তাদের আসা বন্ধ থাকলেও কিংস জয়ের জনপ্রিয়তায় টান পড়েনি। বেইজিংয়ের উদীয়মান মধ্যবিত্ত এবং বিশ্বজুড়ে আসা পর্যটকরা এখনও এই ‘নিরামিষ শিল্প’ উপভোগ করতে মাসজুড়ে অপেক্ষায় থাকেন।



