টাঙ্গাইলের বাসাইলে নেওয়াজ আলীর সাদা চমচম: একটি সাফল্যের গল্প
বৃহস্পতিবার বিকেলে টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার বিলপাড়া গ্রামের একটি ছোট্ট দোকানে দাঁড়িয়ে ছিলেন নেওয়াজ আলী। তাঁর হাতে ছিল নিজের তৈরি সাদা চমচম। ৩২ বছর আগে শুরু হওয়া এই মিষ্টির ব্যবসা আজ সারা জেলায় সুনাম কুড়িয়েছে।
শুরুটা ছিল কঠিন
১৯৯৪ সালে সুজন মিয়া বিলপাড়া বাজারে একটি মিষ্টির দোকান চালু করেন। কিন্তু দেড় বছরেও ব্যবসা জমাতে না পেরে তিনি চাকরি নিয়ে চলে যান মালয়েশিয়ায়। তখন দোকানের দায়িত্ব নেন তাঁর বাবা নেওয়াজ আলী। তিনি খাঁটি ছানা দিয়ে সাদা চমচম বানানো শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই এই চমচমের সুনাম আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
রেসিপির রহস্য
নেওয়াজ আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘খাঁটি দুধ দিয়ে ছানা তৈরি করা হয়। পরে চিনির শিরায় সেদ্ধ করা হয়। অন্যান্য স্থানে মিষ্টিতে ময়দা ব্যবহার করা হয় বেশি। কিন্তু আমরা ময়দা কম ব্যবহার করি। পাঁচ কেজি ছানায় মাত্র ১০০ গ্রাম ময়দা দেই। এ জন্য আমাদের মিষ্টি বেশি সুস্বাদু হয়।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘আল্লাহর রহমত আছে, তাই আমাদের চমচমের এত সুনাম।’
গ্রামের পরিচয় হয়ে উঠেছে চমচম
বিলপাড়া গ্রামটি বাসাইল উপজেলার দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত। একসময় এই গ্রামের রাস্তা ছিল কাঁচা, আর নদীতে সেতু না থাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থাও দুর্বল ছিল। কিন্তু নেওয়াজ আলীর সাদা চমচমের সুনাম ছড়িয়ে পড়ায় এখন অনেক দূর থেকে মানুষ এই প্রত্যন্ত গ্রামে আসেন। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আগে দিনে চার থেকে পাঁচ কেজি মিষ্টি বিক্রি হতো, এখন সেই পরিমাণ বহুগুণ বেড়েছে।
ক্রেতাদের প্রতিক্রিয়া
সাত কিলোমিটার দূরে মির্জাপুর উপজেলার পাকুল্লা গ্রাম থেকে সাদা চমচম কিনতে এসেছেন ব্যবসায়ী মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমার নিজ এলাকায়ও অনেক মিষ্টির দোকান আছে। কিন্তু বিলপাড়ার সাদা মিষ্টির আলাদা স্বাদ। আত্মীয়ের বাড়ি যাবেন, তাই এত দূর থেকে সাদা চমচম কিনতে এসেছি।’
পরিবারের অবদান
নেওয়াজ আলীর ছেলে সুজন মিয়া জানান, দোকান চালু করার দেড় বছর পরেই তিনি বিদেশ চলে গিয়েছিলেন। কয়েক বছর পর ফিরে এসে দেখেন, তাঁর বাবা সাদা চমচম তৈরি করে ব্যবসা জমিয়ে ফেলেছেন। পরে তিনি ২০০৬ সালে বিদেশ থেকে স্থায়ীভাবে ফিরে আসেন। সুজন মিয়া বলেন, ‘এই সাদা চমচম তৈরি করে বিদেশের চেয়ে অনেক বেশি আয় করা যায়।’
দেশজুড়ে সুনাম ছড়ানো
স্থানীয় লোকজন জানান, বিলপাড়া থেকে মাত্র চার কিলোমিটার দক্ষিণে মির্জাপুরের মাহেড়া গ্রামে পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার (পিটিসি) অবস্থিত। সারা দেশ থেকে পুলিশ সদস্যরা এখানে প্রশিক্ষণে আসেন। এ ছাড়া এই কেন্দ্রটি পর্যটনকেন্দ্র ও শুটিং স্পট হিসেবেও ব্যবহার হয়। প্রশিক্ষণ নিতে আসা পুলিশ সদস্য ও ঘুরতে আসা পর্যটকদের অনেকেই ফেরার পথে বিলপাড়ায় যান এবং সাদা চমচম কিনে নিয়ে আসেন। তাঁদের মাধ্যমেই বিলপাড়ার সাদা চমচমের নাম দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে।
স্থানীয় নেতাদের মতামত
কাঞ্চনপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. শামীম আল মামুন বলেন, ‘নেওয়াজ আলীর সাদা চমচম আমাদের এলাকার গর্ব। এই চমচমের কারণেই প্রত্যন্ত গ্রাম বিলপাড়ার নাম ছড়িয়েছে চারদিকে।’ সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) টাঙ্গাইলের সভাপতি মুসলিম উদ্দিন যোগ করেন, ‘আগে চমচম বললে টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ী গ্রামকে বোঝাত। এখন নেওয়াজ আলীর সাদা চমচমের সুনাম পোড়াবাড়ীর চমচমের মতোই ছড়িয়ে পড়েছে।’
নেওয়াজ আলীর এই সাফল্য শুধু একটি ব্যবসায়িক কাহিনী নয়, বরং এটি স্থানীয় অর্থনীতিতে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। তাঁর অধ্যবসায় ও সততা আজ বিলপাড়া গ্রামকে দেশের মানচিত্রে বিশেষ স্থান দিয়েছে।



