রমজানে চকবাজারে শরবতের সমারোহ, ঐতিহ্য ও স্বাদের মিশেলে
মজান মাস এলেই পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী চকবাজারের ইফতারের আয়োজন ভিন্ন মাত্রা পায়। ভাজা-পোড়া, কাবাব, হালিমের পাশাপাশি হরেক রকমের শরবত ক্রেতাদের দৃষ্টি কেড়ে নেয়। সারা দিনের রোজার ক্লান্তি দূর করতে চকবাজারের বাহারি শরবতের কদর বেড়ে যায়, যেখানে বিভিন্ন স্টলে রংবেরঙের শরবত সাজানো থাকে।
মহব্বতি শরবতের জনপ্রিয়তা ও স্বাস্থ্য উপকারিতা
মহব্বতি নামের শরবতের প্রতি ক্রেতাদের বিশেষ আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়, যা প্রতি লিটার ২০০ টাকায় বিক্রি হয় প্রায় সব দোকানে। দোকান মালিক মোহাম্মদ আকাশ দাবি করেন, এটি দিল্লির বিখ্যাত মহব্বতি শরবত—ফল ও দুধের মিশ্রণে তৈরি, যা স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী। তিনি বলেন, "এই শরবতের উপাদান জাফরান, পেস্তা বাদাম, কাঠবাদাম, দুধ আর চিনি। ইফতারে এটা শুধু মুখরোচকই নয়, শরীরও সতেজ করে।" ক্রেতাদের আগ্রহের কারণে ইফতারের আগের কয়েক ঘণ্টায় তাঁর দোকানের সামনে ভিড় জমে যায়।
পেস্তা শরবতের চাহিদা ও বিক্রেতাদের অভিজ্ঞতা
পাশেই পেস্তা বাদামের শরবত বিক্রি করেন মোহাম্মদ মুসা, যার দামও প্রতি লিটার ২০০ টাকা। তিনি ব্যাখ্যা করেন, "রোজা রেখে মানুষ ক্লান্ত হয়ে যায়। সারা দিন উপোস থাকার পর মানুষ হালকা, ঠান্ডা কিছু খুঁজে। তাই পেস্তা বাদামের শরবতের চাহিদা বেশি।" ছয় বছর ধরে শরবত বিক্রি করা মুসা বলেন, ক্রেতার পাশাপাশি দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়েছে, অনেকে কিনতে না পারলেও দেখতে আসে এবং ছবি তোলে। রমজানে তিনি প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ হাজার টাকার শরবত বিক্রি করেন।
শরবতের বৈচিত্র্য ও দামের তালিকা
চকবাজারে শরবতের তালিকায় বৈচিত্র্য কম নয়:
- লাবান ও মাঠা শরবত: প্রতি লিটার ১৬০ টাকা
- বেলের শরবত: প্রতি গ্লাস ২০ টাকা
- মালাই ফালুদা: প্রতি লিটার ২০০ টাকা
- গুড়ের শরবত: প্রতি লিটার ৪০ টাকা, যা তুলনামূলক সস্তা হিসেবে বিক্রি হয়
এছাড়া দই-বড়ার দোকানেও ভিড় দেখা যায়, যেখানে বড় বাটির দই–বড়া ৪০০ টাকা এবং ছোট বাটি ২০০ টাকায় বিক্রি হয়, যা ইফতারির টেবিলে টক-মিষ্টির মিশ্রণে আলাদা স্বাদ যোগ করে।
ক্রেতাদের মতামত ও বাজারের পরিবেশ
ক্রেতা আওলাদ হোসেন পেস্তা বাদামের শরবত কিনতে এসে বলেন, "ইফতারের জন্য যা বিক্রি হচ্ছে, সবই খোলা। ওপরে ধুলাবালু পড়ছে। কতটা স্বাস্থ্যসম্মত, তার কোনো বালাই নেই। এই শরবত দুধের তৈরি, তাই আশা করছি অন্যগুলোর চেয়ে ভালো হবে।" রমজানের বিকেল গড়ালেই চকবাজারে মানুষের ঢল নামে, কেউ আসে পরিবারের জন্য ইফতারি নিতে, কেউ শুধু এই রঙিন আয়োজন দেখতে। ভিড়, হাঁকডাক আর নানা স্বাদের শরবত মিলিয়ে চকবাজারের ইফতারির বাজার রোজার আবহকে আরও জীবন্ত করে তোলে, যেখানে শরবত শুধু পানীয় নয়, বরং রমজানের ক্লান্ত বিকেলে একটু স্বস্তি আর পুরান ঢাকার চিরচেনা ঐতিহ্যের স্বাদ।
