বুধবার ভোর থেকে জামালপুর শহরে বৃষ্টি ঝরছে, কিন্তু সেই বৃষ্টি উপেক্ষা করে সবজি বিক্রি করছিলেন ৬৫ বছর বয়সী হেলাল উদ্দিন। তিনি আজ সকালে জামালপুর শহরের বানিয়া বাজার এলাকায় এক হাতে ছাতা ও অন্য হাতে ভ্যান ঠেলে সবজি বিক্রি করতে বেরিয়েছিলেন।
জীবনের কঠিন বাস্তবতা
হেলাল উদ্দিন জানান, তাঁর দুই মেয়ে ও এক ছেলে। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন, ছেলেও বিয়ের পর আলাদা থাকছেন। তাই এই বয়সেও তাঁকে প্রতিদিন পরিশ্রম করে সংসার চালাতে হয়। তাঁর কোনো চাষের জমিজমা নেই। সবজি বিক্রির আয়ের ওপর নির্ভর করে তাঁর সব খরচ।
দীর্ঘ সময় বৃষ্টিতে ভেজায় একপর্যায়ে ঠান্ডায় কাঁপছিলেন তিনি। এই প্রতিবেদক কথা বললে মুচকি হেসে বলেন, ‘বাপু, ৩ হাজার ২০০ টেহার পুঁজি। ঘরে বয়ে থাকলে চলব ক্যামনে? ঝড়বৃষ্টি তো আর খাওন দিব না। এই বাও-বাজারে দিনরাত খাইটেও সংসার চলবার চায় না।’
প্রতিদিনের জীবনযাত্রা
হেলাল উদ্দিন প্রতিদিন পাইকারি বাজার থেকে দুই-তিন হাজার টাকার বিভিন্ন সবজি কেনেন। ওই সবজিবাহী ভ্যান ঠেলে জামালপুর শহরের বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করেন। এতে অনেক সময় তাঁর ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা আয় হয়। সারা দিন তাঁর ১০০ থেকে ১৫০ টাকা খাবার বাবদ খরচ হয়। বাকি টাকা নিয়ে বাড়িতে ফিরে যান।
ওই আয় দিয়ে সংসার কীভাবে চলে, এমন প্রশ্নে তিনি কিছুক্ষণ নীরব থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এরপর বলেন, ‘আল্লাহ যেমনে চালায়! কোনো রহমে ডাইল-ভাত খেয়ে দিন চলে। ঈদ ছাড়া একটুকরা গরুর মাংস কিনবার সাহস করি না। এক ঈদে মাংস খাইছি—এহন সামনের কোরবানির ঈদে কপালে জুটলে আবার খামু। তবে মধ্যে মধ্যে বাজার থাইক্যা মাছ কিনি। বেচে যাওয়া তরকারি দিয়া রান্না কইরা খাওয়াদাওয়া চলে।’
বাজারের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব
বাজারের প্রসঙ্গ উঠতেই ক্ষোভ আর হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘বাজারের সব জিনিসপত্রে তো আগুন। এডা শুধু আমার অবস্থা না, প্রতিডা গরিব মানুষের একই কষ্ট।’
ছেলে থাকতেও এ বয়সে কষ্ট করার কারণ জানতে চাইলে হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘পোলাডার নিজেরই দিন চলে না। সেও বাজারে বইস্যা ফল বিক্রি করে। বাজারের যে অবস্থা, তার নিজের সংসারই চলে না—আমাগো আর কী দেখাশোনা করব? তাই নিজেরডা নিজেই কইরা খাই।’
কথার ফাঁকে হেলাল উদ্দিনের চোখে–মুখে ক্লান্তি দেখা গেলেও তা প্রকাশ করতে চান না তিনি। জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে বলে ওঠেন, ‘যত দিন শরীর ভালা আছে, তত দিন এমনেই চলব। পরে কী হইব, সেটা তো আর জানি না।’



