হাসনাহেনা ফুলের গন্ধে কি সাপ আসে? গুজব ভাঙল বিজ্ঞান
হাসনাহেনা ফুলের গন্ধে কি সাপ আসে? গুজব ভাঙল বিজ্ঞান

হাসনাহেনা ফুলের গন্ধে কি সাপ আসে? গুজব ভাঙল বিজ্ঞান

কাজলা দিদির বোন ফুলের গন্ধে একলা জেগে থাকে, ঘুম আসে না। মানুষের নাক ফুলের প্রতি সংবেদনশীল। হাসনাহেনা কিংবা কামিনীর মতো রাতে ফোটা ফুলের গন্ধ অতি কড়া। এই কড়া গন্ধে মানুষের ঘুম না-ই আসতে পারে, মানুষ ফুলের গন্ধে উতলা হতেই পারে; তাই বলে সাপেরাও কি ফুলের গন্ধে মাতাল হয়? আদৌ কি তা হতে পারে? যদি না হয়, তাহলে মানুষ কেন মনে করে যে হাসনাহেনা ফুলের গন্ধে সাপ ছুটে আসে? অনেকে আবার হাসনাহেনা ফুলগাছের গোড়ায় সাপ শুয়ে থাকতেও দেখেছেন বলে দাবি করেন, বিশেষ করে গ্রামে। আসলেই কি হাসনাহেনা ফুলের গন্ধে সাপ আকৃষ্ট হয়, নাকি পুরোটাই গুজব?

সাপের ঘ্রাণশক্তি বোঝার উপায়

হাসনাহেনা ফুলগাছের নিচে সাপ দেখা যায়—কথাটা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সাপ আসতেই পারে, তবে ফুলের গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে আসার কোনো কারণই নেই। আমাদের মতো সাপের নাকের ছিদ্র নেই, তাই সরাসরি তাদের নাকের ভেতর গন্ধ প্রবেশ করতে পারে না। গন্ধ বোঝার জন্য এরা জিব ব্যবহার করে। এদের মুখের ভেতর একটি বিশেষ অঙ্গ আছে, সেটির নাম জ্যাকবসনস অর্গান। এটাকে অবশ্য সরাসরি সাপের নাক বলা যায় না, তবে এটি কিছুটা নাকের মতোই কাজ করে। কিন্তু এই অঙ্গেও সরাসরি গন্ধ পৌঁছাতে পারে না। তাহলে সাপ গন্ধ নেয় কীভাবে?

নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন, সাপ ঘন ঘন জিভ বের করে। কিন্তু কেন? সেটা এই গন্ধ নেওয়ার জন্যই। সাপের চেরা জিভ বায়ুমণ্ডলে মিশে থাকা রাসায়নিক কণা সংগ্রহ করে। এসব কণা জিভ পৌঁছে দেয় জ্যাকবসনস অর্গানে। এই অঙ্গ সেই রাসায়নিক কণার প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে বুঝতে পারে আশপাশে কী আছে। এটাকে আর যা-ই হোক ‘গন্ধ নেওয়া’ বলা যায় না। তাই ফুলের সুগন্ধ কিংবা কোনো কিছু পচার গন্ধ সাপের কাছে আলাদা কোনো অর্থ বহন করে না। এগুলো স্রেফ তাদের কাছে কিছু রাসায়নিক সংকেত। আর হ্যাঁ, ফুলের গন্ধ আমরা যেগুলোকে বলি, সেগুলোও কিন্তু রাসায়নিক কণাদেরই কারসাজি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ফুলের সুগন্ধের উদ্দেশ্য

সুগন্ধি ফুলগাছ বংশবিস্তারের জন্য বিভিন্ন কীটপতঙ্গ এবং কিছু ছোট ছোট প্রাণীর ওপর নির্ভরশীল। এসব প্রাণী ফুলের পরাগায়নে সাহায্য করে। এ জন্য ওই সব প্রাণীকে তো ডেকে আনতে হবে! তাই গাছ বিশেষ কিছু কৌশল অবলম্বন করে। ফুল বিশেষ ধরনের উদ্বায়ী ও সুগন্ধি যৌগ বাতাসে ছড়িয়ে দেয়। সেই যৌগ বাষ্পীভূত হয়। তারপর ব্যাপন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। এই সুগন্ধে আকৃষ্ট হয়ে কীটপতঙ্গ ও খুদে প্রাণীরা ছুটে আসে এবং ফুলের পরাগায়ন ঘটায়।

অন্যদিকে এসব উদ্বায়ী গ্যাস আমাদের নাকেও এসে লাগে এবং আমরা সুগন্ধ অনুভব করি। এরও বিশেষ একটি পদ্ধতি আছে। নাকের ওপরের অংশে অলফ্যাক্টরি রিসেপ্টর বা ঘ্রাণগ্রাহক কোষ থাকে। সুগন্ধি পদার্থের রাসায়নিক কণাগুলো বাতাসের সাহায্যে আমাদের নাকের ভেতর দিয়ে গ্রাহক কোষে গিয়ে আটকে যায়। এতে ঘ্রাণগ্রাহক কোষগুলো উদ্দীপ্ত হয় এবং সুগন্ধকে বিশেষ বৈদ্যুতিক সংকেতে পরিণত করে। নাকের ওই অংশে অলফ্যাক্টরি বাল্ব নামে বিশেষ একটি অংশ আছে। গ্রাহক কোষ উদ্দীপ্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই বৈদ্যুতিক সংকেত এই বাল্বের সাহায্যে পৌঁছে যায় মস্তিষ্কের লিম্বিক সিস্টেম ও ফ্রন্টাল কর্টেক্সে। মস্তিষ্ক তখন সেই বৈদ্যুতিক সংকেত বিশ্লেষণ করে বুঝতে পারে গন্ধটি সুগন্ধ নাকি দুর্গন্ধ। এমনকি সেটি কোন জিনিসের গন্ধ, তা-ও বুঝতে পারে।

সুতরাং বুঝতেই পারছেন, হাসনাহেনা, জুঁই, কামিনী কিংবা বকুলের মতো মিষ্টি গন্ধ অনুভব করতে হলে মস্তিষ্কের জটিল রাসায়নিক ও বৈদ্যুতিক প্রক্রিয়ার দরকার হয়। সাপের মস্তিষ্কে এই জটিল রাসায়নিক ও বৈদ্যুতিক ক্রিয়া ঘটানোর কোনো ব্যবস্থাই নেই। তাই ফুলের গন্ধ সাপকে মাতাল করতে পারে না।

তবে কেন সাপ আসে ফুলগাছের নিচে?

এখন প্রশ্ন, সাপ কি তাহলে সুগন্ধি ফুলগাছের নিচে কখনো আসে না? আসে, তবে সেটা গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে নয়, সাপ আসে তার পেটের দায়ে। সাদা রঙের সুগন্ধি ফুলগুলো সাধারণত রাতেই ফোটে। এদের পরাগায়ন হয় কীটপতঙ্গের মাধ্যমে। অর্থাৎ হাসনাহেনা ফুলের সুগন্ধে কীটপতঙ্গ আকৃষ্ট হয়, এরা এসে ফুলের পরাগায়ন ঘটায়। অন্যদিকে এই কীটপতঙ্গই আবার কিছু শিকারি প্রাণীকে আকৃষ্ট করে। যেমন কুনোব্যাঙ, মাকড়সা, টিকটিকি, গিরগিটি ইত্যাদি। এসব প্রাণী আসে পোকা খেতে। এদের আকর্ষণে আবার ছুটে আসে সাপ। টিকটিকি, গিরগিটি কিংবা ব্যাঙ সাপের প্রিয় খাবার।

রাতে খাবারের তালাশে বেরোয় সাপ। হয়তো সুগন্ধি ফুলগাছের নিচ দিয়ে যাচ্ছে, সেটি হতে পারে হাসনাহেনা কিংবা অন্য কোনো ফুলগাছ। সাপ তখন সেখানে খাবারের সন্ধান পায় এবং চুপিসারে এসে টিকটিকি, গিরগিটি কিংবা কুনোব্যাঙকে সাবাড় করে। পেটপুরে খাওয়ার পর সাপ কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেয়। সেটি লোকচক্ষুর আড়ালে হলে ভালো হয়। এর জন্য সবচেয়ে ভালো জায়গা হলো হাসনাহেনা ফুলগাছ। হাসনাহেনার ডালগুলো সাধারণ বৃক্ষের মতো শক্তপোক্ত নয়, অনেকটা লতার মতো হেলে পড়া ভাব আছে। তাই হাসনাহেনার ডালগুলো ঝোপালো হয়ে মাটিতে বিছিয়ে থাকে। এতে গাছের গোড়াটা অনেকটা দুর্ভেদ্য হয়ে ওঠে, যা সাপের বিশ্রামের জন্য আদর্শ জায়গা। তাই অন্য যেকোনো সুগন্ধি ফুলগাছের চেয়ে হাসনাহেনা গাছের নিচেই সাপকে বেশি দেখা যায়।

বিজ্ঞানীদের মতামত

যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী এবং সাপ গবেষক ডক্টর ডেভিড জিসকে এ বিষয়ে বিস্তর গবেষণা করেছেন। তিনি বলেন, ‘সাপ মাংসাশী প্রাণী এবং তাদের বেঁচে থাকা ও শিকারের কৌশল সম্পূর্ণ আলাদা। ফুলের সুগন্ধ সাপের স্নায়ুতন্ত্রে কোনো আকর্ষণ তৈরি করে না। এরা মূলত ছোট ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী ও উভচরদের শিকার করার জন্য আসে। এসব প্রাণীর শরীরের গন্ধ ও তাপমাত্রা অনুসরণ করেই সাপ ছুটে আসে ফুলগাছের নিচে।’

অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের টক্সিনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর ব্রায়ান ফ্রাইয়ের মতে, সাপ কোনো উদ্ভিজ্জ খাবার খায় না, তাই ফুলের প্রতি তাদের কোনো প্রাকৃতিক টান নেই। হাসনাহেনার মতো ঝোপালো গাছগুলোর নিচে স্যাঁতসেঁতে এবং ঠান্ডা পরিবেশ তৈরি হয়। সাপ শীতল রক্তের প্রাণী। নিজেদের শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং রোদের উত্তাপ থেকে বাঁচতে তারা এমন ঘন, ছায়াময় ও শীতল জায়গায় আশ্রয় নেয়। হাসনাহেনা ফুলগাছের আশপাশের পরিবেশ সাপের বিশ্রাম নেওয়ার জন্য আদর্শ জায়গা।

সুতরাং হাসনাহেনা ফুলগাছের গোড়ায় সাপ দেখার যে দাবি অনেকেই করেন, তা মিথ্যা নয়। তবে সাপ ফুলের গন্ধে মাতাল হয়ে গাছের গোড়ায় আসে না। এটি একটি প্রচলিত গুজব, যা বিজ্ঞানসম্মতভাবে ভুল প্রমাণিত হয়েছে।