ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে ফুচকা খাওয়াকে কেন্দ্র করে দুই গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ, হামলা-ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় একটি বিয়ে বাড়িতে হামলা চালিয়ে রান্না করা খাবার, চেয়ার টেবিল ও থালা বাসন ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এতে পণ্ড হয়ে যায় বিয়ের অনুষ্ঠান। রোববার (৩১ মে) রাত ৯টার দিকে এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সংঘর্ষের ঘটনায় ওই এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত
এর আগে দুপুরে উপজেলার উচাখিলা ইউনিয়নের চর আলগী ও মরিচারচর গ্রামের মধ্যে এ ঘটনা ঘটে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সংঘর্ষে অর্ধশতাধিক খড়ের গাদায় আগুন দেওয়া হয়েছে। এছাড়া অন্তত ১৫টি বাড়ির ৪০ থেকে ৫০টি ঘর কুপিয়ে তছনছ করা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, হামলাকারীরা নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার ও অন্তত ২৫টি গবাদিপশু লুট করে নিয়ে গেছে।
বিয়ে বাড়িতে হামলা
এদিকে চর আলগী গ্রামের একটি বিয়ে বাড়িতেও হামলা চালানো হয়। রান্না করা খাবার নষ্ট করে ফেলা হয় এবং বিপুল পরিমাণ থালা বাসন, চেয়ার টেবিল ভাঙচুর করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, কনের অলঙ্কার ও নগদ দুই লাখ টাকাও ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। এতে বিয়ের অনুষ্ঠান পণ্ড হয়ে গেছে।
ফুচকা বিরোধ থেকে সংঘর্ষ
স্থানীয়রা জানান, ঈদের দিন বিকেলে দুই গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ব্রহ্মপুত্র নদের বালুর ঘাট এলাকায় চর আলগী গ্রামের তিন কিশোর মোনায়েম (১৫), খোকা (১৬) ও বাবুল (২০) একটি ভ্রাম্যমাণ দোকানে ফুচকার অর্ডার দেয়। দোকানি ফুচকা এগিয়ে দিলে মরিচারচর গ্রামের দুই তরুণ সায়েম (১৮) ও রবিন (২০) তা কেড়ে নেয়। এ নিয়ে দুই গ্রামের কিশোরদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এতে মোনায়েম, খোকা ও বাবুল আহত হয়।
পরে শনিবার উচাখিলা বাজারে মরিচারচর গ্রামের কয়েকজনকে আটকে মারধরের আশঙ্কার খবর ছড়িয়ে পড়লে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। ওই রাতে চর আলগী গ্রামের সীমান্তে মরিচারচর গ্রামের কয়েকশ মানুষ জড়ো হয়।
মীমাংসার প্রচেষ্টা ব্যর্থ
স্থানীয় সূত্র জানায়, বিষয়টি মীমাংসার জন্য চর আলগী গ্রামের খলিলুল্লাহ কানন তার বন্ধু রাসেলকে ফোন করেন। পরে রাসেল মরিচারচর গ্রামের ইব্রাহিমকে সঙ্গে নিয়ে চর আলগী গ্রামে গেলে ইব্রাহিম হেনস্তার শিকার হন বলে অভিযোগ ওঠে। এ খবর মরিচারচরে ছড়িয়ে পড়লে গ্রামবাসী আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।
এরপর রোববার দুপুরে মরিচারচর গ্রামের মৃত চান মিয়ার ছেলে ইব্রাহিম ও তার মামা আব্দুল খালেক সরকারের নেতৃত্বে বিপুলসংখ্যক লোক দেশীয় অস্ত্র নিয়ে চর আলগী গ্রামে হামলা চালায় বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা। এ সময় বাড়িঘরে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। হামলার সময় নারী ও শিশুরাও মারধরের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
চর আলগী গ্রামের আলাল উদ্দিন জানান, সশস্ত্র হামলার সময় ভয়ে আমার আট মাসের গর্ভবতী মেয়ে তানজিলা বেগম পড়ে গিয়ে আহত হয়। একই বাড়ির আবু সাঈদের স্ত্রীকেও মারধর করা হয়েছে।
অভিযোগ অস্বীকার
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মরিচারচর গ্রামের বাসিন্দা ইব্রাহিম খলিল। তিনি বলেন, ঈদের দিন বিকেলে ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ের বটতলায় তুহিন তার বোন জিনু আক্তারকে নিয়ে ঘুরতে যায়। এ সময় চর আলগী গ্রামের কয়েকজন কিশোর জিনুকে উদ্দেশ্য করে অশ্লীল মন্তব্য ও অঙ্গভঙ্গি করে। প্রতিবাদ করলে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। তিনি আরও বলেন, পরে বাজারে আমাদের গ্রামের রাব্বি ও রবিনের ওপর হামলা হলে তারা আমার দোকানে আশ্রয় নেয়। রাতে বিষয়টি মীমাংসার কথা বলে আমাকে চর আলগী গ্রামে ডেকে নিয়ে মারধর করা হয়। পরে আমাদের গ্রামের লোকজন ক্ষুব্ধ হয়ে সেখানে গেলে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধে।
বিয়ে বাড়িতে হামলার অভিযোগ প্রসঙ্গে ইব্রাহিম খলিল বলেন, বিয়ে বাড়িতে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের বিষয়টি সাজানো নাটক। তারা নিজেরাই নিজেদের আয়োজন ভাঙচুর করে আমাদের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করছে।
স্থানীয় প্রশাসনের বক্তব্য
উচাখিলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ারুল হাসান খান সেলিম বলেন, ঈদের দিন বিকেলে বটতলায় ফুচকার অর্ডার দেওয়াকে কেন্দ্র করে প্রথমে বাগ্বিতণ্ডা সৃষ্টি হয়। পরে যে নারকীয় তাণ্ডব চালানো হয়েছে। তা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে। আমি এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই।
ঈশ্বরগঞ্জ থানার ওসি রবিউল আজম বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।



