স্মৃতির শিমুলগাছ: ভালোবাসার নীরব সাক্ষী
স্মৃতির শিমুলগাছ: ভালোবাসার নীরব সাক্ষী

ছোটবেলায় মাসি বলতেন, গাছেরা মানুষের সব কথা শুনতে পায়। তাই দুঃখের কথা গাছের সামনে বলতে নেই। তারা সেই দুঃখ নিজের পাতায় জমিয়ে রাখে, তারপর একদিন শুকিয়ে যায়। তখন এ কথা বিশ্বাস করতাম না। এখন বয়স বেড়েছে, বহু মানুষকে যেতে দেখেছি, বহু সম্পর্ককে ঋতু বদলের মতো ঝরে যেতে দেখেছি। এখন মনে হয়, গাছও নিশ্চয়ই কাঁদে—শুধু তাদের চোখ নেই বলে আমরা সেই কান্না দেখি না।

পুরোনো শিমুলগাছের গল্প

আমাদের বাড়ির পশ্চিম কোণে একটি পুরোনো শিমুলগাছ ছিল। গাছটার বয়স কেউ জানত না। দাদু বলতেন, তাঁর বাবার ছোটবেলাতেও গাছটা ওইখানে দাঁড়িয়ে ছিল। ফাল্গুন এলে গাছভর্তি লাল ফুল ফুটত। দূর থেকে মনে হতো, কেউ আগুনের আঁচল মেলে দিয়েছে আকাশের নিচে। সেই শিমুলগাছের নিচেই বসতেন আমার ছোট মাসি। মাসির নাম ছিল নন্দিতা, কিন্তু গ্রামের কেউ তাঁকে সেই নামে ডাকত না; সবাই বলত ‘নন্দি বউ’।

মাসির জীবন ও অপেক্ষা

স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে সাদা থান পরে কাটিয়েছেন চল্লিশটা বছর। সকাল হলে তুলসীতলায় প্রদীপ দিতেন, দুপুরে নারকেলের নাড়ু বানাতেন, আর বিকেলে শিমুলগাছের নিচে বসে কাঁথা সেলাই করতেন। একদিন ছোটবেলায় মাসিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম—‘মাসি, তুমি সারা দিন একা একা বসে কী ভাবো?’ মাসি হেসে বলেছিলেন, ‘যারা চলে যায়, তাদের নিয়ে খুব বেশি ভাবতে নেই রে। তারা অভিমান করে।’ আমি বলেছিলাম, ‘তাহলে তুমি কেন প্রতিদিন শিমুলগাছটার দিকে তাকিয়ে থাকো?’ মাসি সেদিন উত্তর দেননি; শুধু গাছের গায়ে হাত বুলিয়েছিলেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অনেক বছর পরে জানতে পেরেছিলাম, আমার মেসোমশাই মারা যাওয়ার আগের দিন নিজের হাতে এই শিমুলগাছের গোড়ায় এক মুঠো মাটি দিয়েছিলেন। বলেছিলেন—‘আমি না থাকলে এর ফুল ফুটলে বুঝবে, আমি তোমার সঙ্গে কথা বলতে এসেছি।’ তার পর থেকে প্রতি ফাল্গুনে শিমুল ফুটলে মাসির মুখে এক অদ্ভুত আলো দেখা যেত। সেই আলো সুখের ছিল না, আবার সম্পূর্ণ দুঃখেরও না; সেটা ছিল অপেক্ষার আলো। মানুষ চলে যাওয়ার পর যে আলো বেঁচে থাকে, হয়তো তারই নাম স্মৃতি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সময়ের নিষ্ঠুরতা ও ফিরে দেখা

সময়ের নিজের খুব নিষ্ঠুর স্বভাব। সে কোনো মানুষের জন্য থেমে থাকে না। এক এক করে দাদু গেলেন, ঠাকুমা গেলেন, বাবা শহরে চলে গেলেন। আমিও পড়াশোনার জন্য গ্রাম ছেড়ে দিলাম। বহু বছর পরে ফিরে এলাম। দেখলাম, বাড়ি আছে, উঠান আছে, তুলসীতলা আছে; শুধু নেই মাসি। শিমুলগাছটাও অর্ধেক শুকিয়ে গেছে। পাড়ার একজন বললেন, মাসি মারা যাওয়ার আগের দিনও নাকি গাছটার নিচে বসেছিলেন। কাঁথার শেষ সেলাইটা শেষ করে গাছের গায়ে মাথা রেখে বলেছিলেন—‘এইবার আমি চলি। এত দিন তুই আমার হয়ে কথা বলেছিস, এবার আমিই ওর কাছে গিয়ে বলব কত কথা জমে আছে।’ পরদিন ভোরে তাঁকে আর জাগানো যায়নি।

সেই বছর আশ্চর্যভাবে শিমুলগাছে কোনো ফুল ফোটেনি। গ্রামের বৃদ্ধরা বলেছিলেন, গাছটার প্রাণ ভেঙে গেছে। জানি না গাছের প্রাণ ভাঙে কি না, কিন্তু সেদিন প্রথম বুঝেছিলাম, কিছু ভালোবাসা মানুষের মৃত্যুর পরও পৃথিবীতে থেকে যায়—কখনো শিমুল ফুল হয়ে, কখনো পুরোনো কাঁথার সেলাই হয়ে, কখনো বিকেলের হাওয়ায় ভেসে আসা কারও নাম হয়ে।

শেষ কথা

আজও যখন ফাল্গুন আসে, শহরের ব্যস্ত রাস্তায় দাঁড়িয়ে কোনো লাল ফুল দেখি; মনে হয়, পৃথিবীর সমস্ত অপেক্ষমাণ মানুষের হৃদয়ে হয়তো একটি করে শিমুলগাছ আছে। যে গাছ প্রতিবছর ফুল ফোটায় না, কিছু কিছু বছর কেবল নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে। হয়তো সব ভালোবাসার রং লাল নয়, কিছু ভালোবাসার রং নিঃশব্দ।