গাঙচিল আইল্যান্ডে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ
গাঙচিল আইল্যান্ডে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ

ছবি: লেখক

চায়ের দোকানকে গ্রাম্য সংসদ বলা হয়। সারা দিনের কাজের শেষে সন্ধ্যায় এসে সবাই মিলে গল্প–আড্ডায় জমে ওঠে রাষ্ট্রের নানান আলোচনা। সেখানে অতি উত্তেজনা কিংবা বয়কট সিস্টেম নেই। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আড্ডা শেষে সবাই যাঁর যাঁর বাড়ি ফিরে যান। কিছু গ্রামে এই ঐতিহ্য এখনো দেখা গেলেও শহরের জীবনে প্রায় বিলুপ্তির পথে। আমার বাসার কিছু দূরে এক চায়ের দোকানে সারা দিন টিভিতে খেলা এবং দৈনিক সংবাদগুলো দেখি। সেদিন বিদ্যুৎ না থাকায় টিভি বাদ দিয়ে সবাই আড্ডায় মেতে উঠেছে। একজন বলল, ‘প্রধানমন্ত্রী আজ একটা দারুণ কাজ করেছেন।’ পাশ থেকে আরেকজন প্রশ্ন করে বসে, ‘কী কাজ?’বলল, তিনি আজ ধর্ষণের পর খুন হওয়া শিশুর বাড়ি গিয়ে তার পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন। প্রশ্নকর্তা এবার বলে ওঠে, প্রধানমন্ত্রীর এই রকম প্রত্যেক ভিকটিমের বাড়ি যাওয়া অসম্ভব। তবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে প্রত্যেক অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া সম্ভব। সুতরাং আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। এভাবে সব বিষয়ে আলোচনার চুলচেরা বিশ্লেষণ চলতে থাকে।

দিন দিন মানুষের মধ্যে ভর করছে নানান দুশ্চিন্তা। চাঁদাবাজি, মব, খুন, ধর্ষণের মতো ঘটনা অধিক হারে বেড়েছে। অপরাধের অপশক্তি জঙ্গল সলিমপুরে প্রশাসনের ক্যাম্পে রাতের আঁধারে গুঁড়িয়ে দেওয়ার সাহস দেখায়। হামে আক্রান্ত হয়ে বাড়ছে শিশুমৃত্যুর হার। চলমান জীবনে নানান অনিয়ম, অভিযোগ, অনিশ্চয়তার মধ্যে মানুষের জন্য সাময়িক আনন্দ নিয়ে আসে ধর্মীয় উৎসবগুলো। চলে গেল কোরবানির ঈদ। গরুর বাজারগুলো উৎসবের আরেক উপলক্ষ হয়ে উঠেছিল। সেই উৎসবকে একটু দীর্ঘ করতে ঈদের পরদিন ২৯ মে সকালে আমাদের ট্যুরের প্ল্যান করা হয়। কোরবানির ঈদ মানে পুরুষের অধিক ব্যস্ততা। সেই ব্যস্ততার মধ্যেই আমরা চার সদস্যের টিম যথাসময়ে বেরিয়ে পড়ি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সকাল ছয়টায় ফ্রি পোর্টের মোড় থেকে পাহাড়িকা গাড়িতে রাঙামাটির উদ্দেশে রওনা হই। আগের রাতে কম ঘুম আর গোশত কাটার ক্লান্ত শরীর নিয়ে গাড়িতে বসতেই সবাই গভীর ঘুমে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গাড়ি শহর ছাড়িয়ে রাউজান, রাঙ্গুনিয়া পেরিয়ে রাঙামাটিতে প্রবেশ করে। উঁচু–নিচু আঁকাবাঁকা পথে দক্ষ চালকের দ্রুতগতির গাড়ির বাঁক নিতেই ঘুমন্ত তারেক ভাইয়ের মাথা জোরে আমার গায়ে ঢলে পড়তেই ঘুম ভেঙে গেল। বাহিরে তাকিয়ে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য চোখে পড়তেই মুহুর্তে ক্লান্তি দূর হয়ে যায়।

পাহাড়ের বুকে সেই আঁকাবাঁকা সড়ক পেরিয়ে সকাল সোয়া আটটায় আমরা পৌঁছে গেলাম রাঙামাটির রিজার্ভ বাজার। নতুন বাসস্টেশনের একটি রেস্তোরাঁয় আমরা নাশতা সেরে নিলাম। এরপর সামান্য হেঁটে আমরা পৌঁছে গেলাম কাঙ্ক্ষিত রিজার্ভ বাজার লঞ্চঘাটে। সকাল ১০টার টিকিট কেটে রাঙামাটির কাট্টলি বাজার যাওয়ার লঞ্চে উঠে বসি। শহর থেকে গ্রামে যাওয়ার জন্য মানুষ লঞ্চে ভিড় করছেন। যথাসময়ে প্রায় দুই শ যাত্রী নিয়ে আমাদের লঞ্চ যাত্রা শুরু করে। সকালে খানিকটা মেঘলা আকাশ দেখা গেলেও এখন সুয্যিমামা যেন তার আপন রূপে জেগে উঠছে। লেকের মাঝখান দিয়ে ছুটে চলছে আমাদের লঞ্চ।

ছবি: লেখক

দূর থেকে মনে হয়, সবুজ পাহাড়কে যেন জড়িয়ে ধরেছে কুয়াশা। আকাশে ভাসমান মেঘ। লেকের মধ্যে ভেসে ওঠা দ্বীপে খেলায় মেতে উঠেছে গাংচিলের দল। কিছু পথ অতিক্রম করলেই লেকের মাঝখানে দেখতে ছোট্ট দ্বীপের মতো ছোট ছোট টিলায় বসতঘর। নারীরা লেকের পানিতে কাপড়, পাতিল ধোয়ার কাজ সেরে নিচ্ছেন। যেন শিল্পীর গানের মতো...

‘এখানে রমণীগুলো নদীর মতন
নদীও নারীর মতো কথা কয়।
এই অবারিত সবুজের প্রান্ত ছুঁয়ে
নির্ভয় নীলাকাশ রয়েছে নুয়ে
যেন হৃদয়ের ভালোবাসা হৃদয়ে ফুটে
আনন্দ, বেদনায়, মিলন-বিরহ সংকটে।’

এভাবে প্রকৃতির নানান সাজ দেখতে দেখতে আমরা ডুবে যাই স্মৃতির রাজ্যে।

চলতে চলতে দুপুর সাড়ে ১২টায় আমাদের লঞ্চ কাট্টলি বাজারে গিয়ে পৌঁছে। লঞ্চ থেকে নামতেই সেখানে আগে থেকে অবস্থানরত গাঙচিল আইল্যান্ড কর্তৃপক্ষের নিজস্ব বোটের মাঝি আমাদের ডেকে নেন। ইঞ্জিনচালিত বোটে উঠে আবার প্রায় ২৫ মিনিটের লেকের পথ পাড়ি দিয়ে আমরা মূল গন্তব্য গাঙচিল আইল্যান্ড রিসোর্টে গিয়ে নামি।

গাঙচিল আইল্যান্ডের ম্যানেজার ইয়াসিন ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আগেই বুকিং দেওয়া জুমঘরে গিয়ে উঠি। সবাই ফ্রেশ হয়ে বসার একটু পরেই দুপুরের লাঞ্চের জন্য আমাদের ডাক আসে। আলুভর্তা, মাছভর্তা ও লেকের মাছ দিয়ে দুপুরের খাবার শেষে আবার জুমঘরে গিয়ে বসি।

জুমঘরে লাল পিঁপড়ার আক্রমণে মাসুদ ভাই ও তারেক ভাই আক্রান্ত হলে আমরা বাইরে উত্তর পাশে জামগাছের ছায়ায় বসানো মাছায় বালিশ নিয়ে শুয়ে পড়ি। কোলাহলমুক্ত গাছের ছায়ায় শীতল বাতাসে কখন ঘুম চলে এসেছে খেয়াল করিনি। হঠাৎ পাহাড়ি হট্টিটি পাখির কান ফাটানো ডাকে ঘুম ভেঙে যায়। পাশেই লেকের পানিতে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ থেকে যাওয়া আরও একটি ভ্রমণ গ্রুপ দল বেঁধে সাঁতারে মেতে উঠেছে। আমাদের সবাইকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলে লাইফ জ্যাকেট নিয়ে আমরাও লেকে নেমে পড়ি। লেকের স্বচ্ছ পরিষ্কার পানিতে দীর্ঘদিন পর প্রায় এক ঘণ্টা সাঁতারে মেতে উঠি। গাঙচিল আইল্যান্ডের সৌন্দর্য লিখে সম্পূর্ণ প্রকাশ করা যাবে না। সে এক অসাধারণ অনুভূতি। আমরা যখন লেক থেকে সাঁতার সেরে উঠি, তখন সূর্য পশ্চিম আকাশে রক্তিম আকার ধারণ করেছে। সূর্যাস্তের সেই মনোরম পরিবেশে অন্য পর্যটকেরাও সবাই ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। আম আর জামগাছ দিয়ে সাজানো গাঙচিল আইল্যান্ডে নানান পাখির কিচিরমিচির শব্দে সন্ধ্যার পরিবেশ অন্য রকম আনন্দ তৈরি করে। গাছের ওপর মানুষের জন্য তৈরি করা ট্রি হাউসগুলো অন্য রকম আকর্ষণ তৈরি করেছে। ঢালে তৈরি দোলনায় চড়তে চড়তে সূর্য ডুবে গেছে। হোটেল বয় বিকালের নাশতার জন্য ডাকতে থাকেন। ফরমালিনমুক্ত কলা, নুডলসের সঙ্গে চা খেয়ে জুমঘরে ঢুকতেই মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়।

তারেক আর ভাগিনা আরজু মিলে গাছ থেকে পড়া পাকা আম কুড়িয়ে আনেন। গাছপাকা হাঁড়িভাঙা আমের স্বাদ এখনো যেন জিবে লেগে আছে। বৃষ্টি থামতেই আমরা জুমঘর থেকে বেরিয়ে পড়ি। পূর্ণিমা রাত ছিল; কিন্ত বৃষ্টি ও মেঘের দাপটের কারণে চাঁদমামা তার পূর্ণ রূপ নিয়ে জেগে উঠতে পারেনি। আমরা লেকের কূল ঘেঁষে বসানো চেয়ার ও টেবিলে বসে আড্ডায় মেতে উঠি। মাসুদ ভাইয়ের মুখে হুমায়ূন আহমেদের নাটকের মজার সংলাপ ও গল্পের শেষে তারেক ভাইয়ের কণ্ঠে লালনের গান...

‘গেরাম বেড়ে অগাধ পানিনাই
কিনারা নাই তরণী পারে।
বাঞ্ছা করি দেখব তারেকে
মনে সে গাঁয় যাই রে।
আমি একদিনও না দেখিলাম তারে।’

এভাবে সময় গড়িয়ে রাত প্রায় ১১টা। রাতের খাবারের ডাক আসায় আড্ডা ছেড়ে রিসোর্টের মেহমানখানায় গিয়ে বসি। গরম পরোটা দিয়ে বারবিকিউর পর জুমঘরে গিয়ে আবারও পাকা আম খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। খুব ভোরে নানান প্রকারের পাখিদের ডাক শুনে ঘুম থেকে জেগে উঠি। সবাই ফ্রেশ হওয়ার পর বের হয়ে আইল্যান্ডের চারপাশে হাঁটতে হাঁটতে ছবির স্মৃতি জমা করি। সকাল আটটায় গরম খিচুড়ি খেয়ে ম্যানেজারের কাছে যাবতীয় বিল পরিশোধ করে বাগান থেকে পাড়া আম কিনে ফেরার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে বোটের জন্য অপেক্ষা করি। আবারও বোট লেকের মাঝে ছুটে চলছে দুই পাশে সবুজ পাহাড়, আকাশে সাদা বক দল বেঁধে উড়ে যাচ্ছে। ছোট্ট নৌকা নিয়ে স্থানীয় লোকজন মাছ শিকারে ব্যস্ত। এভাবে চলতে চলতে দীর্ঘ আড়াই ঘণ্টা বোটে চড়ে ফিরে এলাম রিজার্ভ বাজার। বাসের টিকিট কেটে খাজা হোটেলে দুপুরের খাবার খেয়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অপেক্ষা। ৩টা ৪৫ মিনিটে বাস করে আমরা রওনা হলাম আপন শহর চট্টগ্রামের দিকে।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]