সাজিদ উল হক আবিরের সাহিত্যজীবন: পুরোনো ঢাকা থেকে কমনওয়েলথ পুরস্কার পর্যন্ত
সাজিদ উল হক আবির: সাহিত্যে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

সাজিদ উল হক আবির: সাহিত্যের পথে এক অনন্য যাত্রা

সাজিদ উল হক আবির একজন কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক, যিনি ১৯৯০ সালে পুরোনো ঢাকার ফরিদাবাদে জন্মগ্রহণ করেন। তার প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে গল্পগ্রন্থ শেষ বসন্তের গল্প (২০১৪), আয়াজ আলীর ডানা (২০১৬), কোমা ও অন্যান্য গল্প (২০১৮), কাঁচের দেয়াল (২০১৯) ও নির্বাচিত দেবদূত (২০২৪) উল্লেখযোগ্য। এছাড়া উপন্যাস শহরনামা (২০২২) ও সরীসৃপতন্ত্র (২০২৬), কাব্যগ্রন্থ হেমন্তের মর্সিয়া (২০১৮) এবং অনুবাদগ্রন্থ মিসিং পারসন: প্যাট্রিক মোদিয়ানো (২০১৫, দ্বিতীয় প্রকাশ ২০২১) ও মুরাকামির শেহেরজাদ ও অন্যান্য গল্প (২০২৩) তার সাহিত্যকর্মের বৈচিত্র্য তুলে ধরে। তিনি বর্তমানে ইস্টওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে শিক্ষকতা করছেন।

শৈশব ও লেখালেখির সূচনা

আবিরের লেখালেখির শুরুটা পরিবারের প্রভাব ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মিশেলে। তার বাবা, একজন বিনোদন সাংবাদিক ও ঢাকা থিয়েটারের সক্রিয় কর্মী, শিল্প ও শিল্পী নিয়ে নিয়মিত আলোচনা করতেন। বাড়িতে সঙ্গীত ও বইয়ের সমৃদ্ধ পরিবেশ আবিরের মনে সাহিত্যের বীজ বপন করে। ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির সদস্য হিসেবে তিনি বই পড়ার মাধ্যমে কল্পনার জগৎ খুঁজে পান। পুরোনো ঢাকার ফরিদাবাদ এলাকায়, বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে কাটানো শৈশব-কৈশোর তার লেখায় গভীর প্রভাব ফেলে। তিনি বলেন, "পুরোনো ঢাকা নিজেই একটা গল্পের খনি, যার প্রতিটি গলিতে অসংখ্য ইতিহাস লুকিয়ে আছে।"

প্রথম গল্প ও প্রকাশনা

২০১২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র থাকাকালীন একটি দৈনিক পত্রিকার জন্য "রমিজুদ্দিন মৌলভি ও কয়েকটি কুকুর" শিরোনামে তার প্রথম গল্প রচিত হয়। ২০১৩ সালে সামহয়ারইনব্লগে ব্লগিং শুরু করেন তিনি এবং ২০১৪ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম গল্পগ্রন্থ শেষ বসন্তের গল্প। বইটির মুখবন্ধ লিখেছিলেন প্রফেসর ইমেরিটাস সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, যা আবিরকে নিয়মিত লেখালেখিতে অনুপ্রাণিত করে। ২০১৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত তার ১১টি বই প্রকাশিত হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পুরস্কার ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

আবির নির্বাচিত দেবদূত গল্পগ্রন্থের জন্য কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার ২০২৪ পেয়েছেন। এছাড়া মফিজের রিলেশনে স্পার্ক নাই গল্পের জন্য তিনি কমনওয়েলথ ছোটোগল্প পুরস্কার ২০২৬-এর সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পেয়েছেন। এই স্বীকৃতি তাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি এনে দিয়েছে। তিনি বলেন, "লিখে মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ বাংলাদেশে প্রায় অসম্ভব, কিন্তু এই অসম্ভবটাই সম্ভব হয়েছে।"

গল্পের প্লট ও প্রভাব

আবির গল্পের প্লট দু’ভাবে পান: চিত্র আকারে বা আইডিয়া আকারে। নির্বাচিত দেবদূত গল্পটি একটি বাস্তব ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত, যেখানে তিনি একটি এতিম মাদ্রাসা ছাত্রকে দেখেছিলেন। অন্যদিকে, মফিজের রিলেশনে স্পার্ক নাই গল্পটি একটি বৈজ্ঞানিক স্যাটায়ার, যা মানুষের সম্পর্কের জটিলতাকে ইলেকট্রনের ধারণার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করে। তার লেখায় স্থানীয় প্রেক্ষাপটের পাশাপাশি বৈশ্বিক প্রভাবও লক্ষণীয়, তবে তিনি "গডস পার্সপেক্টিভ" বা ঊর্ধ্বদৃষ্টি বজায় রাখার চেষ্টা করেন।

শিক্ষকতা ও সাহিত্যিক প্রভাব

ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষক হিসেবে আবির বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। তার সাহিত্যিক জীবনে প্রফেসর ফকরুল আলম ও সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের প্রভাব গভীর। ফকরুল আলমের উৎসাহ তাকে লেখালেখিতে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। তিনি বিশ্বাস করেন, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাগুলোতে মৌলিক ভাষা ও সুরকে মূল্যায়ন করা হয়, কোনো নির্দিষ্ট প্যাটার্ন নয়।

ভবিষ্যৎ স্বপ্ন ও পরামর্শ

আবিরের স্বপ্ন হলো আমৃত্যু লিখে যাওয়া এবং তার লেখা দক্ষিণ এশিয়ার সাহিত্যে আলাদা স্থান করে নেয়া। নতুন লেখকদের জন্য তার পরামর্শ হলো লেখালেখিকে প্যাশন হিসেবে চর্চা করা এবং নিজের গল্প বলার শৈলী রপ্ত করা। তিনি বলেন, "প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার জন্য বিশেষ প্রস্তুতির প্রয়োজন নেই, শুধু নিজের সেরা গল্পটা লিখতে হবে।"