কবি ও সংগঠক হাবীব ইমনের আকস্মিক প্রয়াণে নোয়াখালী বন্ধুসভার শোক
৫ এপ্রিল, সকাল ৯টা ৩০ মিনিটে, হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ঢাকার একটি হাসপাতালে মারা গেলেন বিশিষ্ট কবি, লেখক ও সংগঠক হাবীব ইমন। তাঁর আকস্মিক প্রয়াণে নোয়াখালী বন্ধুসভা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
একজন স্কুলের বড় ভাইয়ের বিদায়
হাবীব ইমন ছিলেন নোয়াখালী জিলা স্কুলের ১৯৯৮ ব্যাচের ছাত্র। যদিও আমি ২০১৮ ব্যাচের, তবুও তিনি আমার স্কুলের বড় ভাই হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি স্কুল জীবন থেকেই লেখালেখি, সংগঠন ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে যুক্ত করেছিলেন। বিশেষ করে প্রথম আলো বন্ধুসভার সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ পথচলা ছিল অত্যন্ত গভীর।
নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে, ১৯৯৮ সালের দিকে, প্রথম আলো বন্ধুসভার সূচনালগ্ন থেকেই তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। নোয়াখালী বন্ধুসভার প্রথম কমিটিতে তিনি শিক্ষা ও সংস্কৃতি সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ধীরে ধীরে তিনি সংগঠনের একজন সক্রিয় কর্মী থেকে গুরুত্বপূর্ণ সংগঠকে পরিণত হন।
বন্ধুসভাকে পরিবার হিসেবে দেখা
২০২১ সালে নোয়াখালী বন্ধুসভার এক ঈদ পুনর্মিলনীতে তিনি অংশ নিয়েছিলেন। সেখানে আমি তাঁকে একটি লেখার অনুরোধ করেছিলাম। পরবর্তীতে তিনি ‘বন্ধুসভা—অধিকতর আনন্দের স্বপ্ন’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। সেই লেখায় তিনি বন্ধুসভাকে শুধু একটি সংগঠন হিসেবে না দেখে পরিবার হিসেবে দেখেছিলেন। যেখানে মানুষ একত্র হয়, শেখে, ভাবে এবং বড় হয়।
তাঁর শুরুর দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে তিনি লিখেছিলেন, তিনি খুব বেশি মিশতেন না, একটু নিজের ভেতরেই থাকতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে লেখালেখির মাধ্যমে, পাঠক হিসেবে যুক্ত হয়ে, বন্ধুসভার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তৈরি হয়। নিজের নাম ছাপার অক্ষরে দেখার আনন্দ থেকে শুরু করে পাঠচক্র—সব মিলিয়ে তিনি একসময় পুরোপুরি যুক্ত হয়ে যান এই পরিবারের সঙ্গে।
মানুষকে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছিলেন
হাবীব ইমন তাঁর লেখায় ১৯৯৯ সালের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেছিলেন। অ্যাসিড–সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তহবিল সংগ্রহের সময় তিনি বিভিন্ন স্কুলে যাচ্ছিলেন। একটি স্কুলে গিয়ে ক্লাস সিক্সের এক ছাত্র তার জমানো ৫০০ টাকা তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিল। ছোট একটি মানুষের সেই বড় মন তাঁকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল। তিনি লিখেছিলেন, সেই মুহূর্ত তাঁকে মানুষ ও সমাজকে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে।
ব্যক্তিগত স্মৃতি ও না বলা কথা
হাবীব ইমন ভাইয়ের সঙ্গে আমার পুরোনো কথোপকথনগুলো দেখছিলাম। ফেসবুক ইনবক্স ঘাঁটতে গিয়ে দেখলাম তিনি আমাকে প্রথম মেসেজ করেছিলেন, ‘তুমি করে বলছি। খুব ভালো লেখো।’ ২০২৬ সালে, যখন আমি দ্বিতীয়বার নোয়াখালী বন্ধুসভার সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করি, তিনি আমাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। সেই মেসেজটা প্রথম আজকে দেখেছিলাম, কিন্তু রিপ্লাইটা দেওয়া হয়নি। এখন মনে হচ্ছে, একটা সাধারণ ‘ধন্যবাদ ভাই’ বলাটাই সবচেয়ে বড় না বলা কথা হয়ে রইল।
২০২২ সালে ঢাকায় বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘের জাতীয় লেখক সম্মেলনে গিয়েছিলাম। হঠাৎ রাত হয়ে গেল, থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই। আত্মীয়স্বজন কারও বাসায় যাব না ঠিক করেছিলাম। ভাইকে বলতেই এক মুহূর্ত দেরি করেননি। নিজেই থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন।
সাহিত্যকর্ম ও বহুমাত্রিক পরিচয়
হাবীব ইমন ছিলেন বহুমাত্রিক লেখক ও কবি। তাঁর কলাম ও লেখা জাতীয় দৈনিকগুলোতে নিয়মিত প্রকাশিত হতো। বিশেষ করে কলাম লেখক হিসেবে সমকালীন বিষয়ে তাঁর বিশ্লেষণধর্মী লেখাগুলো পাঠক মহলে বেশ সমাদৃত ছিল। তিনি বাম ধারার যুব গণসংগঠন বাংলাদেশ যুব ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা মহানগরের সাবেক সভাপতি ছিলেন।
ছোট্ট এই জীবনে তিনি রেখে গেছেন একগুচ্ছ সাহিত্যকর্ম। একাধারে কবি ও সৃজনশীল লেখক, সাংবাদিক হিসেবে তিনি বেশ পরিচিত ছিলেন।
শোক ও স্মৃতির মাঝে বেঁচে থাকা
আজ তিনি নেই। কিন্তু তাঁর লেখা আছে, তাঁর কথা আছে, তাঁর দেওয়া ছোট ছোট উৎসাহগুলো আছে। কিছু মানুষ হারিয়ে যায় না, তাঁরা শুধু স্মৃতির ভেতর দিয়ে বেঁচে থাকে। হাবীব ইমন তেমনই একজন।
নোয়াখালী বন্ধুসভার পুরোনো সংগঠকদের ফেসবুক ওয়াল শোকাচ্ছন্ন। পুরো নোয়াখালীর সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষ শোকাহত। তিনি শুধু নোয়াখালীর নন, তাঁর সাহিত্যকর্মের জন্য জাতীয় অঙ্গনেও বেশ পরিচিত মুখ ছিলেন।
ইমন ভাই দেখলেই ডাক দিতেন, গল্প শুরু করে দিতেন। সেদিন ভেবেছি, আবার তো দেখা হবেই, তখন গল্প করব। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, হয় আরেক…। এখন খুব আফসোস হচ্ছে। বুঝতে পারিনি, সেই দেখাটাই যে ওনার সঙ্গে শেষ দেখা। আর কোনো দিন ভাইয়ের সঙ্গে দাঁড়িয়ে গল্প হবে না। খোঁজখবর নেওয়া হবে না।
মাঝখানে একদিন হঠাৎ নক দিয়েছিলেন। একটু রাগ করে বলেছিলেন, ‘আমাকে তো তোমরা এখন ডাকো না। বন্ধুসভায় অনেক দিন আসি না, নোয়াখালী এলে একদিন সময় করে আসব, আড্ডা দেব তোমাদের সঙ্গে।’ সেই আড্ডাটা আর হলো না…



