ঢাকায় 'কলেকশনস...নট ওয়ার্ডস...' শিল্প প্রদর্শনী: আট শিল্পীর নীরব সংলাপ
ঢাকায় 'কলেকশনস...নট ওয়ার্ডস...' শিল্প প্রদর্শনী

ঢাকায় 'কলেকশনস...নট ওয়ার্ডস...' শিল্প প্রদর্শনী: আট শিল্পীর নীরব সংলাপ

প্রদর্শনীর শিরোনামটিই যেন একটি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত বহন করে। এখানে ভাষা শব্দের মাধ্যমে নয়, বরং দৃশ্যের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়; বক্তব্য উচ্চারণের পরিবর্তে অনুভবের মাধ্যমে উপলব্ধি করা যায়। শিল্পকর্মগুলো নিজস্ব নীরবতায় কথা বলে, যেখানে রং, রেখা, গঠন ও উপাদান মিলিয়ে তৈরি হয় একধরনের অন্তর্মুখী সংলাপ। ঢাকার উত্তরায় অবস্থিত গ্যালারি কায়ায় বর্তমানে চলছে ‘কলেকশনস...নট ওয়ার্ডস...’ শীর্ষক একটি দলগত প্রদর্শনী। এই প্রদর্শনীতে আটজন শিল্পীর শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হচ্ছে, যাদের প্রত্যেকের কাজে নিজস্ব ভাষা ও অভিজ্ঞতার প্রাধান্য লক্ষণীয়।

বিভিন্ন প্রজন্মের শিল্পীদের সম্মিলিত প্রকাশ

১৯৪০ থেকে ১৯৬০–এর দশকে জন্ম নেওয়া বিভিন্ন প্রজন্মের এই আট শিল্পীর প্রত্যেকের কাজে নিজস্ব শিল্পভাষা ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার প্রাধান্য রয়েছে। ফলে প্রদর্শনীটি একদিকে যেমন ব্যক্তিগত শিল্পভুবনের সৃজনশীল প্রকাশ, অন্যদিকে তেমনি সমসাময়িক বাংলাদেশের শিল্পচর্চার একটি বহুমাত্রিক মানচিত্রও হয়ে উঠেছে। শিল্পী হামিদুজ্জামান খানের নিসর্গচিত্র নদীমাতৃক বাংলার প্রাণের সন্ধান দেয়, যেখানে প্রকৃতির রূপ ও রঙের অনুরণন দেখা যায়। তাঁর ষাটের দশকে জলরঙে আঁকা ‘রায়েরবাজার’ ও ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম’ ল্যান্ডস্কেপ এই প্রদর্শনীতে একটি বিশেষ মাত্রা যোগ করেছে।

প্রকৃতি ও স্মৃতির কবিত্বময় আবহ

চন্দ্র শেখর দে ও রতন মজুমদারের কাজে প্রকৃতি ও স্মৃতির মিশ্রণ একধরনের কবিত্বময় আবহ তৈরি করে। রতন মজুমদারের কাঠখোদাইয়ে অত্যন্ত যত্নের ছাপ পাওয়া যায়, যেখানে সূক্ষ্ম রেখায় লোকজ মোটিফ ও বাংলার ভূদৃশ্য জ্যামিতিক বিভাজনে সাদা-কালোয় নান্দনিকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। ‘নগ্নতার আনন্দ’ চিত্রে দেখা যায় অন্ধকারে আত্মজিজ্ঞাসায় মগ্ন এক ব্যক্তি, যা শিল্পীর নিজের সঙ্গেই এক নীরব কথোপকথনের প্রতিফলন।

জ্যামিতিক পরিসর ও অনুভূতির স্তর

শিল্পী রঞ্জিত দাসের চিত্রজমিনেও রয়েছে জ্যামিতিক পরিসরের ব্যবহার। ‘সেল্ফ’ শিরোনামের চিত্রে নিজের অবয়বকে ভেঙেচুরে এক আর্তনাদের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছেন তিনি। পাশাপাশি তাঁর নিসর্গদৃশ্যে ভোরের আলো, আকাশ, নদী ও নদীপাড় এক নির্মল প্রার্থনার আবহ তৈরি করেছে, যেখানে দৃশ্যমান বাস্তবতার চেয়ে অনুভূতির স্তরগুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

স্নিগ্ধ রঙের আবেশ ও ভয়ংকর রূপক

শিল্পী আহমেদ শামসুদ্দোহার সুন্দরবনের নিসর্গে স্নিগ্ধ রঙের আবেশে মুগ্ধতা রয়েছে। ‘ঘরে ফেরা’ চিত্রে ঘন কালো মেঘের ভয়ংকর রূপকেও এক মায়াবী রূপে দৃশ্যায়ন করেছেন, যা প্রকৃতির ভয়ংকর রূপের মধ্যেও সৌন্দর্যের উপস্থিতি নির্দেশ করে। শিল্পী শেখ আফজাল হোসেনের কাজের রেখা ও গঠনে অন্তর্গত শক্তি ও ছন্দ দেখা যায়, যেখানে গ্রাম্য মহিলা ও শিশুদের চিরন্তন মায়াগাথা সাংগীতিক গতিময়তায় উপস্থাপিত হয়েছে।

পার্বত্য সাংস্কৃতিক স্মৃতি ও বিমূর্ত রূপান্তর

শিল্পী কনক চাঁপা চাকমার শিল্পভাষা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যেখানে পার্বত্য অঞ্চলের সাংস্কৃতিক স্মৃতি, নারীর অনুভূতি এবং প্রকৃতির নীরব সৌন্দর্য একত্রে উপস্থিত হয়। অন্যদিকে মোহাম্মদ ইকবালের কাজে দেখা যায় সমকালীন জীবনের বিমূর্ত রূপান্তর—রঙের স্তর ও গঠনের ভেতর দিয়ে তিনি একধরনের মানসিক ভূদৃশ্য নির্মাণ করেন।

সমবেত দৃশ্যসংগীত ও প্রদর্শনীর সময়সীমা

এই প্রদর্শনীতে আটজন শিল্পীর কাজ মিলিত হয়ে একটি সমবেত দৃশ্যসংগীত তৈরি করেছে। প্রত্যেক শিল্পীর স্বর আলাদা, কিন্তু তাঁদের সম্মিলনে তৈরি হয়েছে একটি বৃহত্তর সুর—যেখানে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, স্মৃতি, প্রকৃতি ও কল্পনা মিলেমিশে সমসাময়িক বাংলাদেশের শিল্পভাষাকে নতুনভাবে উন্মোচিত করে। পাহাড় থেকে নদী পর্যন্ত, প্রত্যেক শিল্পীর কাজেই বাংলার ভূপ্রকৃতি ও ভূদৃশ্যের প্রাধান্য রয়েছে। ৭ মার্চ শুরু হওয়া এই প্রদর্শনীটি ২৬ মার্চ পর্যন্ত চলবে, যা শিল্পপ্রেমীদের জন্য একটি অনন্য অভিজ্ঞতা সরবরাহ করছে।