ভাষাশহীদ রাফিক উদ্দিন গ্রন্থাগার ও জাদুঘরে বইয়ের সমৃদ্ধি, কিন্তু পাঠকশূন্যতা
মানিকগঞ্জ জেলার সিঙ্গাইর উপজেলার রাফিকনগর গ্রামে অবস্থিত ভাষাশহীদ রাফিক উদ্দিন আহমদ গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘরে বইয়ের সংগ্রহ বিপুল হলেও, সেখানে পাঠক ও দর্শনার্থীর সংখ্যা অত্যন্ত কম। এই প্রতিষ্ঠানটি ২০০৮ সালে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে ও জেলা পরিষদের তত্ত্বাবধানে নির্মিত হয়েছিল, কিন্তু আজও এটি জনসাধারণের কাছে তেমন পরিচিতি পায়নি।
অবস্থান ও নির্মাণের ইতিহাস
জেলা সদর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার এবং সিঙ্গাইর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই গ্রন্থাগার ও জাদুঘরটি পারিল গ্রামে গড়ে উঠেছে, যা এখন ভাষাশহীদদের সম্মানে রাফিকনগর নামে পরিচিত। শহীদ রাফিকের প্রতিবেশী কর্নেল (অব.) মজিবুল ইসলাম খান জমি দান করে এই প্রকল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। গ্রন্থাগার ভবনের সামনের দেয়ালে শহীদ রাফিকের একটি ম্যুরাল এবং ভেতরে দুটি ছবি স্থাপন করা হয়েছে, যা তাঁর স্মৃতিকে ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
গ্রন্থাগারের বইয়ের সংগ্রহ ও কর্মীদের সমস্যা
গ্রন্থাগারিক ফরহাদ হোসেনের মতে, বাংলা একাডেমি থেকে প্রাপ্ত প্রায় ১৬ হাজার বই এখানে সংরক্ষিত আছে, তবে ভাষাশহীদদের নিয়ে লেখা বইয়ের সংখ্যা খুবই সীমিত। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, তিনিসহ মাত্র তিনজন কর্মী এখানে কাজ করছেন, যাদের চাকরি এখনো স্থায়ী হয়নি এবং বেতনও অত্যন্ত সামান্য। এই সমস্যাগুলো গ্রন্থাগারের কার্যক্রমকে ব্যাহত করছে এবং পাঠক আকর্ষণে বাধা সৃষ্টি করছে।
জাদুঘরে স্মৃতিস্মারক ও দর্শনার্থীদের অভিজ্ঞতা
জাদুঘরে ভাষাশহীদ রাফিক উদ্দিনের ব্যবহৃত লুঙ্গি, পাঞ্জাবি, পরিবারের চারটি চেয়ার, একটি টেবিল এবং টেবিল ক্লথ সংরক্ষিত আছে। এছাড়া, ২০০০ সালে পাওয়া তাঁর একুশে পদকের সম্মাননা স্মারকও এখানে রয়েছে। দর্শনার্থী মোহসীন মোহাম্মদ মাতৃক বলেন, 'কয়েক বছর আগে একবার এসেছিলাম, এবার এসে ভাষাশহীদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র দেখে খুব ভালো লেগেছে।' তবে, জাদুঘর দেখভালকারী মো. শাহজালালের মতে, এলাকার ছাত্রছাত্রীরা মাঝেমধ্যে এসে এই স্মারকগুলো দেখে, কিন্তু সামগ্রিকভাবে দর্শনার্থীর সংখ্যা হতাশাজনক।
ভাষাশহীদ রাফিক উদ্দিনের জীবন ও আত্মত্যাগ
বাংলা একাডেমি প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, শহীদ রাফিক উদ্দিনের জন্ম ১৯২৬ সালে মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরের পারিল বলধার গ্রামে। তিনি ঢাকায় থাকতেন এবং ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের মিছিলে অংশ নিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রথম শহীদ হন। তাঁর ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. খোরশেদ আলম জাদুঘর নিয়ে মন্তব্য করেন, 'এটার নাম জাদুঘর হলেও, জাদুঘরে যা থাকার কথা তা নেই। দর্শনার্থীরা এলেও তেমন কিছু না থাকায় আগ্রহ হারিয়ে চলে যান।'
উন্নয়নের দাবি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
স্থানীয়রা এবং পরিবারের সদস্যরা এই গ্রন্থাগার ও জাদুঘরটির উন্নয়নের জন্য সরকারি ও বেসরকারি সহায়তার দাবি জানিয়েছেন। আরও বই সংগ্রহ, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা এবং প্রচার কার্যক্রম বৃদ্ধি করলে এটি ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস সংরক্ষণ ও শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। মানিকগঞ্জের এই ঐতিহাসিক স্থানটি যদি যথাযথ মনোযোগ পায়, তবে তা দেশের সাংস্কৃতিক heritage-এর অংশ হয়ে উঠতে পারে।
