সিরিয়ায় দামেস্ক আন্তর্জাতিক বইমেলা শুরু, ১৪ বছর পর উন্মুক্ত পরিবেশে
বাশার আল-আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গত ৬ ফেব্রুয়ারি সিরিয়ায় শুরু হয়েছে দামেস্ক আন্তর্জাতিক বইমেলা। উদ্বোধনী দিনেই প্রায় আড়াই লাখ মানুষ মেলায় অংশ নিয়েছেন, যা পূর্ববর্তী বছরগুলোর তুলনায় একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যা। মেলার পরিচালক আহমদ নাসান জানিয়েছেন, প্রায় ৩৫টি দেশের ৫০০টির মতো প্রকাশনা সংস্থা এবারের বইমেলায় অংশগ্রহণ করেছে।
প্রকাশকদের জন্য নতুন সুযোগ
আসাদের শাসনামলে কঠোর নিরাপত্তা নজরদারি ও বহু বই নিষিদ্ধ থাকার কারণে অনেক প্রকাশক এই বইমেলায় অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকতেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রকাশকরা নতুন করে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। দামেস্ক আন্তর্জাতিক বইমেলা প্রথম অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৫ সালে, কিন্তু ২০১১ সালের মার্চে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর কয়েক বছর এটি বন্ধ ছিল। ১৪ বছর পর এবারের বইমেলা এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সরকার ও কুর্দি যোদ্ধাদের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষের পর সম্প্রতি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে।
রাজনৈতিক পরিবর্তন ও কুর্দি সম্প্রদায়
দামেস্কের নতুন সরকার কুর্দিদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছে যে তারা নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সমান নাগরিক হিসেবে স্বীকৃত হবেন। অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট আহমদ আল-শারা সম্প্রতি এক ডিক্রি জারি করে কুর্দিদের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়া, কুর্দি ভাষাকে রাষ্ট্রের অন্যতম সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি এবং তাদের প্রধান উৎসব নওরোজকে স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। এই পদক্ষেপগুলো বইমেলার প্রেক্ষাপটে একটি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
ধর্মীয় বই নিয়ে বিতর্ক ও উদ্বেগ
সুন্নি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ সিরিয়ায় আগের বইমেলাগুলোতেও ধর্মীয় বই ছিল বেশ জনপ্রিয়। তবে এবারের বইমেলায় একটি নতুন দিক লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বহু বছর ধরে নিষিদ্ধ থাকা ইসলামি চিন্তাবিদ ইবনে তাইমিয়্যার বই এ বছর খোলামেলাভাবে বিক্রি হতে দেখা যায়। তার শিক্ষাদর্শ সুন্নি জিহাদি গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ব্যাপক অনুসৃত, যা চরমপন্থি মতাদর্শ ছড়িয়ে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় এসব বইয়ের প্রচলন নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
গত এক বছরে সরকারপন্থি সুন্নি যোদ্ধাদের সাম্প্রদায়িক হামলায় শত শত আলাউই ও দ্রুজ সম্প্রদায়ের মানুষ নিহত হয়েছেন। আলাউই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য আসাদ আনুষ্ঠানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ মতাদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। তার পরিবার-শাসনের পাঁচ দশকে মুসলিম ব্রাদারহুডসহ বিভিন্ন ইসলামপন্থি গোষ্ঠীর ওপর কঠোর দমন-পীড়ন চালানো হয়।
নিষিদ্ধ বইয়ের তালিকা
এ বছর “হ্যাভ ইউ হিয়ার্ড দ্য টক অব দ্য রাফিদা?” বইটি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এতে আল-কায়েদার নেতা আবু মুসাব আল-জারকাউইয়ের অডিও ভাষণ সংকলিত রয়েছে। ২০০৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় নিহত জারকাউইয়ের বক্তব্য শিয়া মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ উসকে দেয়, এমন অভিযোগে ইরাক সরকার বইটি সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ জানায়। এই নিষেধাজ্ঞা বইমেলায় স্বাধীন প্রকাশনা ও মত প্রকাশের সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
সামগ্রিকভাবে, দামেস্ক আন্তর্জাতিক বইমেলা সিরিয়ার সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি প্রতিফলন হিসেবে কাজ করছে। প্রকাশক, লেখক ও পাঠকরা নতুন আশা নিয়ে এই মেলায় অংশ নিচ্ছেন, যদিও ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বই নিয়ে বিতর্ক চলমান রয়েছে।
