বসন্তের কবিতায় প্রকৃতি ও প্রেমের নিবিড় আলেখ্য
অপেক্ষাতুমি প্রেম অবদমন, তুমি তো কুহেলিকা—এই লাইন দিয়ে শুরু হয় কবিতাটি, যা বসন্তপুর গ্রামের ধারে ফুটে থাকা ফুটফুটে নদীর চিত্র আঁকে। ছুটে যাওয়া ডাক, প্রান্তরের পাখি, আর দূরে বিদীর্ণ আকাশের দৃশ্য পাঠককে এক গভীর আবেগের জগতে নিয়ে যায়। কবিতায় যা কিছু মুখাপেক্ষী, তা সারস—মিনারের দৈর্ঘ্য নিয়ে ফুটে আছে হেমলক, ফুটন্ত ও টসটসে, যেন বিদীর্ণ নিমফলের মতো।
প্রকৃতির মাঝে মানবিক অনুভূতি
কবি প্রশ্ন তোলেন, ধ্যানবিন্দু কীসের যেন নাম? ফুটে থাকা কি কারাগার? ধুতুরার মতো তুমি চেয়ে থাকো, ধুতুরার মতো আমি চেয়ে থাকি—এই পংক্তিগুলো প্রেম ও অপেক্ষার দ্বন্দ্বকে প্রকাশ করে। রঙের অভিমুখে বাদামফুলের ঘ্রাণ জাগে, যা দূরে গণ্ডগ্রামের ভেতরে বাড়িতে রেখে আসা স্মৃতির সাথে জড়িত। ফুলের জন্য প্রার্থনা পাখিদেরও থাকে, আর আজ সেই ফুল ফুটেছে, ফুটেছে গন্ধের মুকুল নিজের ভিতরে।
ক্ষণকালের কাছে কে দেয় বৃহৎ খোঁচা, কামনা-কাঙ্ক্ষা, মুঠো মুঠো শিমুল মদিরা? ফাল্গুনে আছে আরেকটি রঙের দিকে যাবার প্রণোদনা। পথযাই কুসুম কথা নিয়ে, যে আছে নুয়ে তার দিকে, যাই ফুল ও ঘ্রাণসমেত, বকুল পাতারা আছে নুয়ে। যেতে যেতে মনোপথ, গাছেরা আরো ছায়া হোক, যেতে যেতে বালিহাঁস, উল্লাস, দূর কাছে এলো।
পথ ও পতনের গল্প
যেতে যেতে কাছের রেখা সরে যায় দূরে, মুগ্ধ পথের রেখা বিস্মৃত হলো শেষে। মোকামতলা হাঁটার বাসনা অধীর হচ্ছে, প্রাণের ভেতর সুগন্ধী দহকাল। সমস্ত আঁচড় মাধুডাঙার তীরে দুমড়ে উঠছে, যেন ভ্রমের পাখির আওয়াজ বন্দি করেছে। পদ্মার খরস্রোত কণ্ঠে তুলে নিয়েছি, ঘাসেরাও মর্মরে মরে।
আবর্তন করছে যত গোলকধাঁধা, তার ঘূর্ণনবিদ্যা বুঝি না। গুঞ্জরণ যত তা ওই ভাঁটফুলের, সুগন্ধী দহকাল তা ওই মাধুডাঙার। এও এক রসের মোকামতলা, আধেক ফুটে আছে লীলা। যুগলবৈভব ওই যে প্রান্তরের দিকে সযত্ন ঘাসফুল, তার নিঃসঙ্গ ওম, বিদ্যুৎ ফুটছে। এবং যা কিছু যুগলবৈভব, কাছাকাছি সুদূর, নকশা আঁকা দেয়ালব্যঞ্জনের পাশে হঠাৎ ফুটে ওঠা।
রোম ও রোহিনী, কাম ও কমল, অথই বিষফল। ঘোড়া ও প্রান্তর, দিক ও দিগ্বিদিক ছুটে যাচ্ছে হেরেমের খেতে, এবং প্রস্তুত হওয়ার আগেই রোহিনী বক্রবাঙ্ময়, একবার বক্রতার দিকে, একবার সম্মুখের দিকে জুড়ে আছে তার সযত্ন ঘাসফুল এবং কে বিনত ব্যাকুল!
শেষের দিকে নিঃশব্দতা ও পতন
অলখের পাথার বাহিয়া, শিশিরেও শীর্ষে আর কে আছে গানের ওপরে? ঋতুহীন বসন্তে কখনো কখনো এই ঘনবদ্ধ মৌনতার চেয়ে রাতের নীরবতা বেশি ভালো। নির্জন স্বরের কানে চুপিচুপি কথা বলা যেতে পারে, শৌখিন বাঁক ঘুরে কথারা নিজ কানে কানে ফিরে আসে। ও প্রান্তে ধ্যানমগ্ন শিশিরপতন—এ প্রান্তে নিয়মমাফিক জ্যোৎস্না ঝরিয়েছে জল।
সুরের শরীরে তন্দ্রাহীন মাটির ফোঁড় ফোঁড় বুকের উপরে অজস্র কম্পন লুকিয়ে থাকে, অজস্র চাহনি জ্বালিয়ে সুদীর্ঘ রাত তারা এইখানে জেগে আছে। সমস্ত সংবেদনা শেষে চাঞ্চল্য রেখেছে পৌষের হিম আদিগন্তে, মুঠো মুঠো নাড়ার শরীরে। এখন নিকট নক্ষত্রের চেয়ে নিঃশব্দ, নীল চোখের চাইতে হিম, ভাষাহীন।
পাখিদের অনেক স্লোগান পতনের দিনে ঝরছে এতগুলি পাতা! এইসব কারুবাসনাও ঝরে যাবে। তোমার চোখ ক্রমাগত ছুঁয়ে যাচ্ছে ক্ষুধা ও ফেনা। এইসব মহাপতনের ক্ষণে, ভগ্নপ্রায় বটগাছটির নিচে অঢেল ক্রন্দনে দুজনে মুখস্থ করছি পাখিদের অনেক স্লোগান।
মুহূর্তসারাদিন ফুটল শিমুল, ঝরে পড়লো, শুকাল রক্তরঙ। ক্ষুদ্র মুহূর্তের কাছে ঝরে পড়লো আরেকটি ক্ষুদ্র মুহূর্ত। যেতে যেতে তোমার দিকে, পথের দিকে একা যাই। হয়ত এ পথে লুকানো আছে মহিমা মুহূর্ত শেষের। পাখিটা কুহুস্বরে গাইছিল, তোমার দিকে পথ থামলো। ভাবতে চাইনি কোন বিষাদভাবনা, তবু মুহূর্ত ভাঙলো।
রমণ ও প্রস্থানের ইঙ্গিত
এইসব ত্যাগ ও তিতিক্ষার দিনে বসন্তের শেষ পাতাটি ঝরার আগে কী পান করালে? মৃত্যু ও পতন সুধা নয় গরল, মুহূর্তের এক ফোটা চিরন্তন? উসকে যাচ্ছে যত গুপ্ত আশা, গুহ্যবিহবলতা স্তনের বোঁটা কাঁপাচ্ছে দ্যাখো দেহের সমগ্রতা। ফুটে আছে যত বিপুল মৃদুল বসন্তবাতাস, ছড়ানো ছিটানো পরাগ ও রমণ ব্যাপার, জেগে উঠছে ধীরে নখের ক্ষিপ্রতা, সবই মৃদু হন্তারক।
এখন হুহু বাতাসে ফের মৃত্যুর দিকে যাওয়া যেতে পারে বিপরীতকামী ঘ্রাণ ও প্রশ্বাসে, শঙ্খ ও সযত্নে পতনস্বভাবে। প্রস্থানবিন্দু এইমাত্র খসে পড়া উড়ন্ত পাতাটির হলুদ শিরা বেয়ে কান্না নেমে আসে, ঝলকে ওঠে হঠাৎ মৃত্যুর উলম্ব ছবি। এই পাতা কি বয়োবৃদ্ধ গাছের আত্মাছবি? সহস্র হলুদ আর্তনাদ! সমতল ভূমি বরাবর এইসব পাতাই কি ক্রমশ সমাপ্তিবিন্দু আর দুঃস্বপ্নের মতো অবশিষ্ট?
