ডেনিস লিভারটভ: মার্কিন কবিতার এক অপ্রতিম কণ্ঠস্বর
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর যুক্তরাষ্ট্র যেসব কবিকে সেলিব্রেট করেছে, তাদের মধ্যে ডেনিস লিভারটভ (২৪ অক্টোবর ১৯২৩—২০ ডিসেম্বর ১৯৯৭) এক অনন্য স্থান দখল করে আছেন। দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে তিনি রেখে গেছেন ঈর্ষণীয় এক কবিতার পৃথিবী, যেখানে প্রকৃতি, প্রেম, প্রার্থনা, যুদ্ধ, যন্ত্রণা, দর্শন ও মরমি মূর্ছনা একসঙ্গে মিশে আছে। মার্কিন কবি অ্যামি গার্স্টলারের ভাষায়, "লিভারটভকে মূল্যায়ন করতে গেলে মর্যাদা, ভক্তি আর শক্তি—এই শব্দগুলোই প্রথমে মাথায় আসে।"
শৈশব ও প্রারম্ভিক জীবন: বহুভাষিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা
ডেনিস লিভারটভের জন্ম ইংল্যান্ডের ইলফোর্ডে। তাঁর মা বিয়াট্রিস অ্যাডিলেড স্পুনার-জোন্স ছিলেন ওয়েলশ বংশোদ্ভূত, আর বাবা পল ফিলিপ লেভারটফ একজন রুশ ‘হাসিদিক ইহুদি’। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ‘হাসিদিক’ পরিচয়ের কারণে পলকে ‘ভিনদেশি শত্রু’ হিসেবে গৃহবন্দী করা হয়। মুক্তি পেয়ে তিনি যুক্তরাজ্যে চলে আসেন এবং খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হয়ে অ্যাংলিকান যাজকে পরিণত হন।
পারিবারিক পরিবেশে ছোটবেলা থেকেই লিভারটভ বই আর বহুভাষিক আলাপচারিতার মধ্যে বড় হয়েছেন। মা বিয়াট্রিস উনিশ শতকের সেরা সাহিত্য ও টেনিসনের কবিতা শোনাতেন, আর বাবা ছিলেন হিব্রু, রুশ, জার্মান ও ইংরেজি ভাষার দক্ষ লেখক। এই জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিমণ্ডল তাঁকে অতি অল্প বয়সেই লেখালেখির দিকে টেনে নেয়—মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তিনি ঘোষণা দেন লেখক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা।
কবিতায় অভিষেক ও প্রাথমিক স্বীকৃতি
মাত্র ১২ বছর বয়সে লিভারটভ টি এস এলিয়টকে নিজের লেখা কবিতা পাঠান। এলিয়ট তাঁকে "চমৎকার সব পরামর্শ" দিয়ে দীর্ঘ চিঠি প্রেরণ করেন, যা তরুণ কবিকে অদম্য স্পৃহা এনে দেয়। ১৯৪০ সালে, ১৭ বছর বয়সে, তাঁর প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় প্রভাবশালী পোয়েট্রি কোয়ার্টারলি পত্রিকায়।
শুরুর দিকে সমালোচক হার্বার্ট রিড, সম্পাদক চার্লস রে গার্ডিনার ও কবি কেনেথ রেক্সরথের মতো ব্যক্তিত্বরা তাঁর পাশে দাঁড়ান। রেক্সরথ মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন, "তিনি ছিলেন ‘নব্য রোমান্টিকতাবাদের’ কনিষ্ঠতম সদস্য।" প্রথাগত শিক্ষার অভাবই লিভারটভের কবিতাকে করে তুলেছিল অসম্ভব স্বচ্ছ, সুনির্দিষ্ট ও সহজবোধ্য।
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন ও কাব্যশৈলীর বিবর্তন
১৯৪৭ সালে ডেনিস বিয়ে করেন মার্কিন লেখক মিচেল গুডম্যানকে এবং পরের বছর যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। ১৯৫৫ সালে তিনি মার্কিন নাগরিকত্ব লাভ করেন। আমেরিকাকে নিজের দেশ হিসেবে গ্রহণ করার পর, সেখানকার কথ্যভাষার ভঙ্গি তাঁকে দারুণভাবে আকর্ষণ করে।
এ সময় ‘ব্ল্যাক মাউন্টেন’ কবিগোষ্ঠীর প্রভাবে তাঁর কবিতায় পরিবর্তন আসে। চার্লস ওলসন ও রবার্ট ক্রিলির মতো কবিরা প্রথাগত ছন্দের বাইরে কবিতার গঠন ও স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশের ওপর জোর দিতেন। লিভারটভ ‘প্রোজেক্টিভ ভার্স’ বা অভিক্ষিপ্ত কাব্যরীতির দিকে ঝুঁকে পড়েন, যেখানে কবিতার ছন্দ বা কাঠামোর চেয়ে বিষয়বস্তুর স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ বেশি গুরুত্ব পায়।
রাজনৈতিক সক্রিয়তা ও যুদ্ধবিরোধী কবিতা
ষাটের দশকে ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন হস্তক্ষেপ লিভারটভের ব্যক্তিজীবন ও কবিতায় আমূল পরিবর্তন আনে। তিনি মনে করতেন, "ভিয়েতনাম যুদ্ধের অন্যায্যতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো একজন কবির নৈতিক দায়িত্ব।" এই বিশ্বাস থেকে তিনি মুরিয়েল রুকেসার ও অন্যান্য কবিকে নিয়ে ‘রাইটার্স অ্যান্ড আর্টিস্টস প্রটেস্ট’ গঠন করেন।
যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ-সমাবেশে সক্রিয় অংশ নিয়ে তিনি বার্কলেসহ নানা জায়গায় কবিতা পাঠ করতে থাকেন। আইন অমান্য করার কারণে তাঁকে কয়েকবার জেলও খাটতে হয়। তাঁর উল্লেখযোগ্য কবিতার বইগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- দ্য সরো ড্যান্স (১৯৬৭)
- রিলার্নিং দ্য অ্যালফাবেট (১৯৭০)
- টু স্টে অ্যালাইভ (১৯৭১)
- ক্যান্ডেলস ইন ব্যাবিলন (১৯৮২)
এই বইগুলো ভিয়েতনাম যুদ্ধ, ডেট্রয়েট দাঙ্গা ও পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের মতো সামাজিক-রাজনৈতিক ইস্যুতে মুখর ছিল। গবেষকরা মনে করেন, লিভারটভ তাঁর কবিতায় ব্যক্তিগত কল্পনাশক্তির মাধ্যমে সামষ্টিক পরিবর্তনের কথা বলতেন এবং ব্যক্তির ক্ষমতার ওপর জোর দিতেন।
ধর্মীয় রূপান্তর ও আধ্যাত্মিক কবিতা
১৯৭৫ সালে লিভারটভ-মিচেলের ২৮ বছরের দাম্পত্য জীবনের সমাপ্তি ঘটে। ১৯৮৪ সালে খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর তাঁর লেখায় ধর্মীয় প্রভাব গাঢ় হয়ে ওঠে। তিনি পূর্ণ মনোযোগ দেন ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ কবিতার দিকে।
১৯৮৭ সালে প্রকাশিত ব্রিদিং দ্য ওয়াটার বইটিতে ধর্মীয় উপাদানের দিকে জোর দেওয়া হয়। মার্কিন কবি ডায়ান ওয়াকোস্কি মন্তব্য করেন, "লিভারটভ স্রষ্টাকে খুঁজে পেয়েছেন নিজের অভ্যন্তরে।" ১৯৯০ সালের ১৮ নভেম্বর তিনি সিয়াটলে চলে আসেন এবং সেন্ট এডওয়ার্ডস প্যারিসে ক্যাথলিক ধর্ম গ্রহণ করেন।
শিক্ষকতা, অনুবাদ ও সাহিত্যকর্ম
কবিতার বাইরে লিভারটভ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। তিনি বেশ কিছু সাহিত্যকর্ম অনুবাদ করেছেন, যার মধ্যে ফরাসি কবি জ্যঁ জুবেরের কাজ বিশেষভাবে সমাদৃত। ১৯৬৭ সালে তিনি এডওয়ার্ড সি ডিমক জুনিয়রের সঙ্গে যৌথভাবে অনুবাদ করেন ইন প্রেজ অব কৃষ্ণা: সংস ফ্রম দ্য বেঙ্গলি, যা মধ্যযুগীয় বাংলার বৈষ্ণব পদাবলির সংকলন।
তাঁর প্রকাশিত প্রবন্ধ সংকলনগুলোর মধ্যে দ্য পোয়েট ইন দ্য ওয়ার্ল্ড, লাইট আপ দ্য কেভ ও নিউ অ্যান্ড সিলেক্টেড এসেস ব্যাপকভাবে আলোচিত। গবেষকরা মনে করেন, এই প্রবন্ধগুলোয় কাব্যতত্ত্ব, নন্দনতত্ত্ব ও রাজনীতির বিস্তৃত প্রতিফলন ঘটেছে।
পুরস্কার, সম্মাননা ও উত্তরাধিকার
লিভারটভ ২৪টি কাব্যগ্রন্থের পাশাপাশি সমালোচনা ও অনুবাদ প্রকাশ করেছেন। তাঁর অর্জনের তালিকা দীর্ঘ, যার মধ্যে রয়েছে:
- শেলি মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড
- রবার্ট ফ্রস্ট মেডেল
- লেনোর মার্শাল প্রাইজ
- ল্যানান অ্যাওয়ার্ড
- গুগেনহেইম ফেলোশিপ
৭৪ বছর বয়সে লিম্ফোমায় আক্রান্ত হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। মরণোত্তর প্রকাশিত হয় দিস গ্রেট আননোয়িং: লাস্ট পোয়েমস (১৯৯৯)। বর্তমানে ডেনিস লিভারটভকে দেখা হয় এক "গভীর মিস্টিক বা রহস্যবাদী কবি" হিসেবে, যিনি খ্রিষ্টধর্মকে ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যবর্তী সেতু হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। কবিতার আঙ্গিক নিয়ে তাঁর ‘অর্গানিক ফর্ম’ তত্ত্বটি আজও বিশ্বজুড়ে শিক্ষার্থীদের পড়ানো হয়, যা তাঁর স্থায়ী প্রভাবের সাক্ষ্য বহন করে।
