প্রকাশক ঐক্যের জোরালো দাবি: একুশে বইমেলা ঈদের পর আয়োজনের আহ্বান
অমর একুশে বইমেলা ২০২৬-এর তারিখ নিয়ে প্রকাশকদের সংগঠন প্রকাশক ঐক্য গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে ধরেছে। সংগঠনটি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে চিঠি পাঠিয়ে বইমেলাটি ২০ ফেব্রুয়ারির পরিবর্তে ঈদুল ফিতরের পর আয়োজনের জন্য হস্তক্ষেপ চেয়েছে। পাশাপাশি, দেশের প্রকাশনাশিল্পকে রুগ্ণ অবস্থায় উল্লেখ করে এই শিল্প রক্ষায় তারেক রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।
চিঠিতে উত্থাপিত মূল বিষয়গুলো
প্রকাশক ঐক্য তারেক রহমান বরাবরে পাঠানো চিঠিতে স্পষ্ট করে বলেছে, তাদের উদ্দেশ্য মেলা বর্জন নয়, বরং একটি ‘সফল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক মেলা’ আয়োজন করা। সংগঠনটির যুক্তি হলো, পবিত্র রমজান মাস ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি বিবেচনায় মেলাটি পিছিয়ে ঈদের পর আয়োজন করা উচিত। এই সময়ে পাঠকদের হাতে পর্যাপ্ত সময় ও আর্থিক সক্ষমতা থাকবে বলে তারা মনে করেন।
চিঠিতে প্রকাশকরা অভিযোগ করেছেন, তাদের যৌক্তিক দাবিগুলো উপেক্ষা করে একপ্রকার জোর করেই তাদের একটি ব্যর্থ মেলার দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের সামনের সারির প্রায় সব প্রকাশকসহ তিন শতাধিক মূলধারার প্রকাশক অংশ নিতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন।
তারেক রহমানের নির্দেশনা ও নতুন সরকারের প্রতি প্রত্যাশা
প্রকাশক ঐক্য চিঠিতে তারেক রহমানকে উদ্দেশ্য করে বলেছে, ‘সামনেই আপনি সরকার গঠনের মাধ্যমে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছেন। একটি নতুন সরকারের যাত্রা শুরুতে আমরা চাই না একুশের চেতনার এই মেলাটি কোনোভাবে ব্যর্থ বা বিতর্কিত হোক।’ সংগঠনটি বিশ্বাস করে, তারেক রহমানের একটি সুচিন্তিত নির্দেশই ধ্বংসের হাত থেকে এই শিল্পকে বাঁচাতে পারে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য বাংলাদেশের সৃজনশীল প্রকাশক সমাজের পক্ষ থেকে তারেক রহমানকে উষ্ণ অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানানো হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘আপনার এই একটি সিদ্ধান্ত কেবল হাজারো প্রকাশককে দেউলিয়া হওয়া থেকে বাঁচাবে না, বরং প্রমাণ করবে যে নতুন সরকার জ্ঞান, সৃজনশীলতা ও জনমতের প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল।’
প্রকাশনাশিল্পের বর্তমান সংকট ও মেলা আয়োজনের চ্যালেঞ্জ
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রায় দেড় বছর ধরে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতায় প্রকাশনাশিল্প এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনের কারণে গত দুই মাস দেশের ছাপাখানাগুলো নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত থাকায় সৃজনশীল বই উৎপাদনের কাজ পুরোপুরি বন্ধ ছিল। এছাড়াও কাগজের আকাশচুম্বী দাম এবং আনুষঙ্গিক সংকটে প্রকাশকেরা আজ দিশাহারা হয়ে পড়েছেন।
এমন এক বাস্তবতায়, বিদায়ী প্রশাসন ও বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে মাহে রমজানে ‘অমর একুশে বইমেলা ২০২৬’ আয়োজনের বিষয়ে অনড় অবস্থানে রয়েছে। প্রকাশকরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, রোজার ফলে দেশের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাবে, এবং শিক্ষার্থীরাই বইমেলার প্রাণ। তাদের অনুপস্থিতিতে এবং রোজার মাসে অনুষ্ঠেয় এই মেলা নিশ্চিতভাবেই পাঠকশূন্য ও নিষ্প্রাণ হয়ে উঠবে।
দেশের ৯০ ভাগ প্রকাশক মনে করছেন, এই সময়ে মেলায় অংশগ্রহণ করা হবে তাঁদের জন্য ‘ব্যবসায়িক আত্মহত্যা’র শামিল। এই অবস্থায় কাদের স্বার্থ রক্ষার্থে এই মেলা আয়োজনে এত তৎপরতা, তা নিয়ে প্রকাশকদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
প্রকাশকদের তালিকা ও সমর্থন
দেশের সর্বস্তরের প্রকাশকদের পক্ষে চিঠিতে ১৪ জন প্রকাশকের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁরা হলেন:
- মেছবাহউদ্দীন আহমদ (আহমদ পাবলিশিং হাউজ)
- এ কে নাসির আহমেদ (কাকলী)
- মাজহারুল ইসলাম (অন্যপ্রকাশ)
- মনিরুল হক (অনন্যা)
- সৈয়দ জাকির হোসাইন (অ্যাডর্ন পাবলিকেশন)
- জসীম উদ্দিন (কথাপ্রকাশ)
- মোহামম্মদ নাজিম উদ্দিন (বাতিঘর প্রকাশনী)
- মো. মোবারক হোসেন (পাণ্ডুলিপি সমন্বয়ক, প্রথমা প্রকাশন)
- মো. গফুর হোসেন (রিদম)
- ইকবাল হোসেন সানু (লাবনী)
- দীপঙ্কর দাশ (বাতিঘর)
- মো. জহির দীপ্তি (ইতি প্রকাশন, সদস্য, অমর একুশে বইমেলা কমিটি ২০২৬)
- মাহরুখ মহিউদ্দীন (ইউপিএল: সদস্য, অমর একুশে বইমেলা কমিটি ২০২৬)
- মাহাবুর রাহমান (আদর্শ; সদস্য, অমর একুশে বইমেলা কমিটি ২০২৬)
চিঠিটির অনুলিপি আজ শনিবার গণমাধ্যমে পাঠিয়েছে প্রকাশক ঐক্য সংগঠনটি, যা দেশের প্রকাশনা জগতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
