মৌলভীবাজারে হেলিকপ্টারে চীনা কনে আসায় উৎসবমুখর গ্রাম
মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার টিকরপাড়া গ্রামে হেলিকপ্টারে চড়ে চীনের কনে আসার খবরে পুরো এলাকা উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। পরিবারের পক্ষ থেকে বিষয়টি গোপন রাখার চেষ্টা করা হলেও খবরটি দ্রুত আশপাশের গ্রামগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে বৃহস্পতিবার বিকেলে হেলিকপ্টার অবতরণের আগেই গ্রামের মাঠে নারী-পুরুষ, শিশু থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সী মানুষের ভিড় জমে ওঠে।
হেলিকপ্টার অবতরণ ও কনের আগমন
বিকেল চারটার দিকে কামারচাক ইউনিয়নের টিকরপাড়া গ্রামের মাঠে কনেকে নিয়ে হেলিকপ্টার অবতরণ করে। বর সুকান্ত সেন—প্রয়াত স্বপন কুমার সেন ও শিল্পী রানি সেনের ছেলে—দীর্ঘদিন ধরে চীনে বসবাস করছেন। তার স্ত্রী ক্রিস হোয়ে চীনের সাংহাইয়ের বাসিন্দা। হেলিকপ্টার থেকে নামার পর ফুল দিয়ে তাদের বরণ করে নেয় পরিবারের সদস্যরা। পরে প্রদীপ জ্বালিয়ে কনেকে ঘরে তোলা হয়।
এর আগে দুপুর থেকেই বরের বাড়ি ও আশপাশের সড়ক সাদা ও রঙিন কাপড়ে সাজানো হয়। বাড়ির পাশের মাঠে লাল পতাকা টাঙিয়ে একটি অস্থায়ী হেলিপ্যাড তৈরি করা হয়। স্থানীয় মানুষজন আকাশের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন—গ্রামে প্রথমবারের মতো হেলিকপ্টার নামবে, সঙ্গে আসবেন ভিনদেশি কনে।
স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া ও অভিজ্ঞতা
পাশের চাটিগাঁও গ্রাম থেকে আসা ৭৫ বছর বয়সী সুপ্রভা দে বলেন, "জীবনে কখনো হেলিকপ্টার কাছ থেকে দেখেননি। এমন আয়োজন এই এলাকায় আগে হয়নি।" একই গ্রামের শর্মি ধর বলেন, "দূরদেশের বউ দেখতে এসেছেন—এমন বিয়ে এই প্রথম দেখছেন।"
পরিবার সূত্রে জানা যায়, সুকান্ত সেন বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতকোত্তর শেষে প্রায় আট বছর আগে চীনে যান। পরে সাংহাই মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি থেকে আরেকটি ডিগ্রি নিয়ে আমদানি-রপ্তানির ব্যবসা শুরু করেন। ব্যবসার সূত্রেই ক্রিস হোয়ের সঙ্গে পরিচয় ও পরে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তাঁরা চীনে বিয়ে করেন। পরে পরিবারের সম্মতিতে বাংলাদেশে হিন্দুধর্মীয় রীতিতে আনুষ্ঠানিক বিয়ের আয়োজন করা হয়েছে।
কনের পটভূমি ও অনুভূতি
ক্রিস হোয়ে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে এটি তাঁর দ্বিতীয়বার আসা এবং সবার আন্তরিকতায় তিনি মুগ্ধ। হেলিকপ্টারে করে গ্রামে আসার অভিজ্ঞতা তাঁর জন্য ব্যতিক্রমী ও আনন্দের।
বরের বোন ঐশী সেন, যিনি বর্তমানে সাংহাই মেরিটাইম ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করছেন, জানান—ক্রিস অল্প সময়েই পরিবারের সবার আপন হয়ে উঠেছেন এবং নিজেই প্রথাগত আয়োজনে বিয়ের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন।
আনুষ্ঠানিকতা ও সাংস্কৃতিক মিলন
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ২১ ফেব্রুয়ারি গায়েহলুদ, ২২ ফেব্রুয়ারি বিয়ের মূল আনুষ্ঠানিকতা এবং ২৪ ফেব্রুয়ারি বৌভাত অনুষ্ঠিত হবে। আত্মীয়স্বজনের পাশাপাশি গ্রামবাসীকেও নিমন্ত্রণ করা হয়েছে।
স্থানীয় শিক্ষক ও কবি জয়নাল আবেদীন (শিবু) বলেন, "এই বিয়ের মাধ্যমে দুই সংস্কৃতির মিলন ঘটছে, যা সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের সুন্দর দৃষ্টান্ত।"
কনেকে নামিয়ে দিয়ে হেলিকপ্টার চলে গেলেও বরের বাড়িতে রাত পর্যন্ত ভিড় ছিল। মিষ্টিমুখ করানো হয় উপস্থিত মানুষদের। অল্প সময়েই ভিনদেশি ক্রিস হোয়ে হয়ে উঠেছেন সেন পরিবারের নতুন সদস্য—গ্রামের মানুষের কৌতূহল ও আনন্দের কেন্দ্রবিন্দু।
