চীনের কনেকে হেলিকপ্টারে করে মৌলভীবাজারের গ্রামে আনলেন প্রবাসী বর
চীনের কনেকে হেলিকপ্টারে করে মৌলভীবাজারে আনলেন বর

চীনের কনেকে হেলিকপ্টারে করে মৌলভীবাজারের গ্রামে আনলেন প্রবাসী বর

মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার টিকরপাড়া গ্রামে আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের সাক্ষী হয়ে উঠেছে। চীনের কনেকে হেলিকপ্টারে করে গ্রামে নিয়ে এসেছেন প্রবাসী বর সুকান্ত সেন। এই প্রথমবারের মতো গ্রামে হেলিকপ্টার অবতরণ এবং ভিনদেশি কনের আগমন ঘটায় এলাকায় ব্যাপক উৎসাহ ও কৌতূহলের সৃষ্টি হয়েছে।

হেলিকপ্টারের অপেক্ষায় গ্রামবাসী

বেলা সাড়ে তিনটার দিক থেকেই টিকরপাড়া গ্রামের খোলা মাঠে অসংখ্য মানুষ জড়ো হতে শুরু করেন। সবার চোখ আকাশের দিকে—কখন হেলিকপ্টার আসবে। গ্রামের মেঠোপথ ও মাঠ পেরিয়ে নারী-পুরুষ, শিশুসহ সব বয়সের মানুষ ছুটে এসেছেন বরের বাড়ির কাছের মাঠে। বাড়ির দক্ষিণ দিকের মাঠে লাল পতাকা টাঙিয়ে হেলিকপ্টার নামার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। পুলিশ সদস্য ও পরিবারের লোকজন মাঠের কাছে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন।

পাশের গ্রাম চাটিগাঁও থেকে আসা সুপ্রভা দে (৭৫) বলেন, ‘এর আগে আর হেলিকপ্টার–বিমান দেখছি না। এলাকায় এ রকম ঘটনা এর আগে আর ঘটছে না।’ একই গ্রামের শর্মি ধর যোগ করেন, ‘দূরদেশ থেকে বউ আসছে। দেখতে আসছি। এই প্রথম এ রকম বিয়ে দেখছি। অনেক ভালো লাগছে।’

হেলিকপ্টার অবতরণ ও অভ্যর্থনা

বিকেল চারটার দিকে খড়কুটো ও ধুলা উড়িয়ে হেলিকপ্টারটি মাঠে অবতরণ করে। হেলিকপ্টার থেকে কনে ক্রিস হোয়ে, তাঁর মা এবং বর সুকান্ত সেন নেমে আসেন। বাড়ির লোকজন তাঁদের ফুল দিয়ে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। এরপর কনেকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় এবং প্রদীপের আলো জ্বালিয়ে বর-বধূকে ঘরে প্রবেশ করানো হয়। এ সময় বাড়িতে আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড় জমে ওঠে।

বর ও কনের পরিচয়

বর সুকান্ত সেন টিকরপাড়া সেন বাড়ির প্রয়াত স্বপন কুমার সেন ও শিল্পী রানি সেনের ছেলে। তিনি বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতকোত্তর শেষে প্রায় আট বছর আগে চীনে চলে যান। সেখানে সাংহাই মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি থেকে আরেকটি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন এবং আমদানি-রপ্তানির ব্যবসা শুরু করেন।

কনে ক্রিস হোয়ে চীনের সাংহাইয়ের বাসিন্দা। তিনি স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতকোত্তর করেছেন। সুকান্ত সেন জানান, তাঁরা ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি চীনে বিয়ে করেছেন। ব্যবসার সূত্রে পরিচয়ের পর থেকে সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং দুই পরিবারের সম্মতিতে হিন্দুধর্মীয় রীতিতে আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে এই বিয়ের আয়োজন করা হয়েছে।

বরের অনুভূতি ও পরিকল্পনা

সুকান্ত সেন বলেন, ‘আমার দেশের বাইরে বিয়ে করার কোনো পরিকল্পনা ছিল না। কেউ হয়তো আমাদের সংযোগ ঘটিয়ে দিয়েছে। আমি তিন বছরের বেশি সময় ধরে তাঁকে জানি। সবকিছু মিলিয়ে আমি খুব খুশি, সে–ও খুশি।’ ক্রিস হোয়ে বলেন, ‘আমার দ্বিতীয়বার বাংলাদেশে আসা। সবাই বন্ধুভাবাপন্ন। সবাই উষ্ণ অভ্যর্থনা দিয়েছে। হেলিকপ্টারে আসাটা ব্যতিক্রমী। আমার জন্য খুবই উপভোগ্য হয়েছে।’

বরের পরিবার জানিয়েছে, ২১ ফেব্রুয়ারি গায়েহলুদ, ২২ ফেব্রুয়ারি বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা এবং ২৪ ফেব্রুয়ারি বৌভাতের আয়োজন করা হয়েছে। আত্মীয়স্বজন ও গ্রামবাসীকে নিমন্ত্রণ করা হয়েছে। আগামীকাল শুক্রবার ক্রিস হোয়ে-এর বাবা ও চাচা আসবেন বলে জানা গেছে।

পরিবার ও এলাকাবাসীর প্রতিক্রিয়া

সুকান্ত সেনের বোন ঐশী সেন, যিনি চীনের সাংহাই মেরিটাইমস ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করছেন, বলেন, ‘সে (ক্রিস হোয়ে) খুবই আন্তরিক। অল্প সময়ে আমাদের খুবই আপন করে নিয়েছে। সে নিজেই চাইছিল এ রকম প্রথামতো বিয়ে হোক।’ বরের জ্যাঠাতো ভাই আশিস কুমার সেন বলেন, ‘এই বিয়েতে আমরা খুশি। আমরা সব সময় যার যার ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিই। যে যার সঙ্গে ইচ্ছা সংসার করে ভালো থাকবে, সে রকমই হওয়া উচিত।’

কামারচাক ইউনিয়নের শিক্ষক ও কবি জয়নাল আবেদীন (শিবু) বলেন, ‘দুই সংস্কৃতির মানুষের এই সম্পর্ক ভালোই। সংস্কৃতির আদান-প্রদান হবে।’ হেলিকপ্টার চলে যাওয়ার পরও বাড়িতে ভিড় জমে ছিল এবং পরিবারের পক্ষ থেকে উপস্থিত লোকজনকে মিষ্টিমুখ করানো হয়েছে।

এই ঘটনা টিকরপাড়া গ্রামে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যেখানে প্রযুক্তি ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনে এক অনন্য বিয়ের আয়োজন সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।