ঈদযাত্রায় মিশ্র অনুভূতি: সিরাজগঞ্জে স্বস্তি, গোবিন্দগঞ্জে উদ্বেগ
পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে আত্মীয়-পরিজনের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে মানুষ ঘরমুখী যাত্রা শুরু করেছে। পরিবারসহ মানুষ বাস, ট্রেন ও লঞ্চে করে রাজধানী ঢাকা ছাড়ছে। তবে উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার খ্যাত ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে এবারের যাত্রার চিত্র কিছুটা বৈচিত্র্যময়।
সিরাজগঞ্জ অংশে অবকাঠামোগত উন্নয়নের সুফল
যমুনা সেতুর পশ্চিমপাড় থেকে হাটিকুমরুল পর্যন্ত ১১টি উড়ালসেতু ও সার্ভিস রোড চালু হওয়ায় সড়ক ব্যবস্থাপনায় এক বিশাল মাইলফলক সৃষ্টি হয়েছে। বিগত এক দশকে এই পথে যাত্রীদের যে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে, চার লেনের পূর্ণাঙ্গ সুবিধা ও আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থার মাধ্যমে তার অবসান ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে, সিসি ক্যামেরা ও ড্রোন ব্যবহার করে মহাসড়ক পর্যবেক্ষণের উদ্যোগটি আধুনিক ও সময়োপযোগী। লক্কড়-ঝক্কড় গাড়ি চলাচল নিষিদ্ধকরণ এবং অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ নিশ্চিত করা গেলে সিরাজগঞ্জ অংশে এবার এক ঐতিহাসিক স্বস্তিদায়ক ঈদ যাত্রা সম্ভব হবে।
গোবিন্দগঞ্জ অংশে নির্মাণকাজের দীর্ঘসূত্রতা ও জনদুর্ভোগ
অন্যদিকে, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ অংশে ২০১৮ সালে শুরু হওয়া ছয় লেন ও উড়ালসড়ক নির্মাণকাজ নির্দিষ্ট সময়ের তিন বছর পরেও সমাপ্ত না হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। পান্তাপাড়া থেকে মহিলা কলেজ পর্যন্ত মাত্র দুই কিলোমিটার এলাকায় নির্মাণসামগ্রীর স্তূপ ও সরু বিকল্প পথ এখন উত্তরবঙ্গগামী যাত্রীদের জন্য আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের এই দীর্ঘসূত্রতা কেবল সাধারণ মানুষের ভোগান্তিই বাড়াচ্ছে না, বরং ঈদের সময় এই জনপদকে এক বিশাল যানজটের জালে আবদ্ধ করার ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে।
যদিও প্রশাসন ১৫ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত কাজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তথাপি বর্তমান অবস্থার উন্নয়ন না ঘটলে কেবল কাজ বন্ধ রাখে যানজট নিরসন করা কতটুকু সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। উত্তরের এই ঈদ যাত্রাকে নির্বিঘ্ন করতে গোবিন্দগঞ্জে যেখানে টিন দিয়ে ঘেরা রয়েছে, সেই সকল স্থানে রাস্তার দুই পার্শ্ব থেকে দ্রুত বালু ও নির্মাণসামগ্রী সরিয়ে রাস্তা চলাচলের উপযোগী করতে হবে।
প্রশাসনের বিশেষ উদ্যোগ ও তদারকি প্রয়োজন
সিরাজগঞ্জের মতো গোবিন্দগঞ্জেও অতিরিক্ত পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েনের পাশাপাশি ড্রোন বা প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি বৃদ্ধি করতে হবে। গাইবান্ধা প্রশাসক জানিয়েছেন যে, সেখানে ইতিমধ্যে পুলিশকে সংযুক্ত করা হয়েছে এবং গোবিন্দগঞ্জ চৌরাস্তায় পুলিশ বক্স স্থাপন করা হচ্ছে। তবে এর পাশাপাশি যানজট তীব্র আকার ধারণ করলে ছোট যানবাহনের জন্য পূর্বনির্ধারিত বিকল্প বাইপাস সড়ক সচল রাখতে হবে। মহাসড়কের যে কোনো স্থানে কোনো গাড়ি বিকল হলে তা দ্রুত সরানোর জন্য পর্যাপ্ত রেকার বা ক্রেন মজুত রাখতে হবে।
আমরা মনে করি, যে কোনো জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রকল্প যথাসময়ে সম্পন্ন করা প্রয়োজন। এতে জনগণের অর্থের সদ্ব্যবহার যেমন হবে, তেমনি তাদের দুর্ভোগ কমে গিয়ে তারা উপকৃত হবেন। এই জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্প পরিচালকের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা দরকার। আলোচ্য ক্ষেত্রে কেন দীর্ঘ কয়েক বছরেও ফ্লাইওভার বা উড়ালসড়কের নির্মাণকাজ শেষ হলো না, তার তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে নিয়মমাফিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক, যাতে ভবিষ্যতে উন্নয়ন প্রকল্পসমূহ সাধারণ মানুষের গলার কাঁটা না হয়ে দাঁড়ায়।
সরকারের সদিচ্ছা ও অব্যবস্থাপনার দ্বন্দ্ব
পরিশেষে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সরকারের সদিচ্ছা ও অবকাঠামোগত উন্নতির সুফল উত্তরবঙ্গের মানুষ পেতে শুরু করেছে। তবে গোবিন্দগঞ্জের মতো বিচ্ছিন্ন কিছু অব্যবস্থাপনা যেন সমগ্র সফলতাকে স্নান না করে দেয়, সেই দিকে নজর দিতে হবে। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি সিরাজগঞ্জের মতো গোবিন্দগঞ্জেও কঠোর ও সুশৃঙ্খল নজরদারি নিশ্চিত করতে পারে, তবেই ২০২৬ সালের এই ঈদ যাত্রা সত্যই এক দশকের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ঈদ যাত্রায় পরিণত হবে।
