মাছাপুচ্ছ্র অভিযানে শেরপাদের শর্ত ও পর্বতের লুকানো বিপদ
মাছাপুচ্ছ্র অভিযানে শেরপাদের শর্ত ও বিপদ

মাছাপুচ্ছ্র অভিযানে শেরপাদের শর্ত ও অভিযাত্রীদের সংগ্রাম

পাঁচভোরের আলো ফুটতেই তিলক লিম্বু অভিযাত্রীদের তাঁবুর সামনে হাজির হলো। তার সঙ্গে ছিল বিশ্বস্ত সহকারী লাকপা শেরপা। দুজনের মুখে ক্লান্তির গভীর ছাপ, চোখ লালচে ও ফোলা। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, তারা রাতে একটুও ঘুমাতে পারেনি। ইখতিয়ার হামিম তাদের দেখে অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন, 'রাতে ঘুমাওনি? চোখ-মুখ এত ফোলা কেন?'

তিলক মাথা নেড়ে উত্তর দিলো, 'ঘুমাতে পারলাম কোথায় দাই! সারারাত ভয়ে ভয়ে কাটালাম। চোখের পাতা এক মিনিটের জন্যও জড়ো হয়নি।' তিলক কথা বলার সময় লাকপা শেরপা নীরব রইল। মনে হচ্ছিল, সে ভয়ের আসল কারণ জানে, কিন্তু অজানা শক্তির চাপে কিছু বলতে ভয় পাচ্ছে।

ইখতিয়ারের কৌশল ও শেরপাদের শর্ত

ইখতিয়ার হামিম বিষয়টি লক্ষ্য করে কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'কীসের ভয়? শরীরের রোগ ওষুধে সারে, কিন্তু মনের ভয়ের ওষুধ নেই।' তিলক চুপ করে রইল। ইখতিয়ার বুঝলেন, তিলকের ভেতরে টানাপড়েন চলছে। সংসারের খরচ ও রুটি-রুজির চিন্তা তাকে দুর্বল করে তুলেছে। ইখতিয়ার মনে মনে ভাবলেন, এটাই তার জন্য সুযোগ। তিলক ভেঙে পড়েছে, তাই তাকে রাজি করানো সহজ হবে।

ইখতিয়ার নরম চোখে তিলকের দিকে তাকালেন। তিলক মাথা নিচু করে বলল, 'আমাদের সিদ্ধান্ত জানাতে এসেছি দাই।' ইখতিয়ার জিজ্ঞেস করলেন, 'জানাও।' তিলক সরাসরি বলল, 'শেরপারা তোমাদের সঙ্গেই থাকবে, তবে একটা শর্ত আছে। তারা চূড়ার একশ মিটার নিচে থেমে অপেক্ষা করবে, তোমরাই সামিট করবে।'

ইখতিয়ার সম্মতি জানিয়ে বললেন, 'শর্তটা মানার মতো। তোমাদের বিশ্বাসকে সম্মান করি।' এবার লাকপা শেরপা মুখ খুলল, 'আর কোনো শর্ত নেই। এই শর্ত মানলে তোমাদের সঙ্গে থাকতে আপত্তি নেই।' ইখতিয়ার হাসিমুখে বললেন, 'ঠিক আছে, তাহলে আমরা একসঙ্গে এগোবো।' তবে তিনি বুঝতে পারলেন, শেরপাদের সম্মতি অন্তর থেকে নয়, বাধ্য হয়েই তারা রাজি হয়েছে।

পর্বতের লুকানো বিপদ ও অভিযাত্রীদের প্রস্তুতি

গত কয়েকদিন ধরে অভিযাত্রীরা তাঁবুর ভেতরে আটকে ছিল। তুষারঝড় ও প্রচণ্ড ঠান্ডা তাদের পথচলা থামিয়ে দিয়েছিল। আজ আবহাওয়া অনুকূলে আসতেই তারা দ্রুত প্রস্তুতি সম্পন্ন করল। অক্সিজেন, দড়ি, কুঠার ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে নিলো। মাছাপুচ্ছ্রের শৃঙ্গে ওঠা অত্যন্ত কঠিন, কারণ এখানে বেসক্যাম্প ছাড়া আর কোনো ক্যাম্প নেই। থামতে হলে নিজেদের তাঁবু খাটাতে হয়, যা খুবই দুরূহ কাজ।

সব প্রস্তুতি শেষে তারা ধীরে ধীরে উপরের দিকে উঠতে শুরু করল। যতই উপরে উঠছে, বাতাস পাতলা হয়ে আসছে, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। তবু তারা একে অপরকে সাহস দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। উপরে ওঠার পর প্রথম কাজ হলো নিরাপদ জায়গায় তাঁবু খাটানো। এখানে বাতাসে অক্সিজেনের মাত্রা খুবই কম, তাই সীমিত অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে দ্রুত শীর্ষে উঠে ফিরতে হবে।

পর্বতারোহীদের আসল লক্ষ্য শুধু চূড়ায় ওঠা নয়, বরং নিরাপদে ফিরে আসা। তাই প্রতিটি পদক্ষেপ মাথা ঠান্ডা রেখে নিতে হয়। কয়েকদিন আগে তারা শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখতে তাঁবু থেকে দেড়শ মিটার উপরে উঠেছিল, তারপর ফিরে এসেছে। এই নিয়ম মানা জরুরি, যাতে শরীর উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে।

বরফের দেওয়াল ও বিশ্রামের সিদ্ধান্ত

প্রায় দুই ঘণ্টা পর অভিযাত্রীদের সামনে পড়ল বিশাল এক খাড়া বরফের দেওয়াল। দেওয়ালটা এতই উঁচু যে, ওটাকে অতিক্রম করা সহজ নয়। আলোচনার পর ঠিক হলো, লাকপা শেরপা প্রথমে উঠবে টপ রোপ অ্যাঙ্কর বসাতে। শেরপারা বরফের দেওয়ালে নিরাপদ জায়গা খুঁজে অ্যাঙ্কর বসাচ্ছে, অন্যরা দড়ি গুছিয়ে নিচ্ছে।

টানা পরিশ্রমে সবাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তিলক লিম্বু চারপাশে তাকিয়ে বুঝতে পারল, আজ আর এগোনো সম্ভব নয়। ক্লান্ত শরীর নিয়ে খাড়া বরফের দেওয়াল বেয়ে ওঠা ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ। তাই তিনি সিদ্ধান্ত দিলো, আজকের মতো বিরতি নিতে হবে। নিরাপদ জায়গায় তাঁবু খাটিয়ে বিশ্রাম নেওয়াই এখন জরুরি।

অভিযাত্রীরা তিলকের সিদ্ধান্ত মেনে নিলো, কারণ শেরপা সরদারের কথা সবার কাছে চূড়ান্ত। বরফের উঁচু দেওয়ালের নিচের সমতল জায়গায় তাঁবু খাটানো হলো। শেরপারা দড়ি টেনে তাঁবুগুলো শক্ত করে বাঁধল, যাতে হঠাৎ বাতাসেও তা উড়ে না যায়। কাজ শেষে সবাই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল।

শান্ত পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

আজকের আবহাওয়া অনেকটাই শান্ত। শৃঙ্গের গায়ে সূর্যের আলো ঝলমল করছে, বরফের সাদা চাদর উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। অভিযাত্রীরা তাঁবুর ভেতরে তাস খেলতে বসল, হাসি-ঠাট্টায় সময় কাটাতে লাগল। শেরপারা দ্রুত রান্নার কাজ শেষ করে গরম ভাত, ডাল ও সবজি পরিবেশন করল। খাবারের স্বাদে সবাই ক্লান্তি ভুলে গেল।

তারপর সবাই নিজেদের স্লিপিং ব্যাগে ঢুকে পড়ল। শরীর গরম হতেই চোখের পাতা জড়ো হয়ে এলো। এই বিশ্রামের পর তারা আবারো মাছাপুচ্ছ্রের চূড়ার দিকে এগিয়ে যাবে, লুকানো ফাটল ও খাড়া বরফের দেওয়ালের মোকাবিলা করবে। পর্বতের অজানা পথে তাদের সংগ্রাম চলতেই থাকবে।