কাপ্তাই হ্রদ ও পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত: এক অনবদ্য ভ্রমণ অভিযান
বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির উদ্যোগে সম্প্রতি কাপ্তাই হ্রদ ও চট্টগ্রাম পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে এক মনোরম ভ্রমণ আয়োজন করা হয়। এই ট্যুরে অংশগ্রহণ করেছিলেন কয়েক প্রজন্মের মানুষ, যা ব্যবস্থাপনায় কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছিল। তবে গবেষক জুলফিকার আলী ভুট্টোর সক্রিয় সহযোগিতায় সব সমস্যা সমাধান সম্ভব হয়। ষাটের কাছাকাছি বয়সেও তিনি টগবগে তরুণের মতো সক্রিয় ছিলেন, যা দলের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক ছিল।
চট্টগ্রাম যাত্রা ও চুয়েট ক্যাম্পাসে প্রথম রাত
সন্ধ্যা ছয়টায় ঢাকা থেকে বাস ছেড়ে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে রওনা হয় দলটি। মধ্যরাত নাগাদ চুয়েট ক্যাম্পাসে পৌঁছে সেখানকার গেস্ট হাউসে রাত কাটানো হয়। সকালে দ্রুত উঠে চুয়েটের টিএসসি ক্যাফেটেরিয়ায় নাশতা সেরে নেওয়া হয়। মুরগি তেহারি ও সবজি-ডালের স্বাদ উপভোগ করেন সবাই। ক্যাম্পাসের চারপাশের সবুজ গাছপালা ও সকালের রোদ ভ্রমণকারীদের মুগ্ধ করে।
কাপ্তাই হ্রদের অপরূপ সৌন্দর্য ও আদিবাসী বাজার
পরের দিন সকালে রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদের উদ্দেশ্যে রওনা হয় দলটি। পথে খরস্রোতা কর্ণফুলী নদী ও পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তার দৃশ্য উপভোগ করেন সবাই। বাংলাদেশ নৌ–পরিবহন কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে থাকা ঘাট থেকে নৌকা ভাড়া করে ১০ আর ই ব্যাটালিয়ন ক্যাম্পের দিকে যাত্রা শুরু হয়। হ্রদের সবুজাভ ও পরিষ্কার পানি, দুই পাশের ছোটবড় টিলা সবাইকে বিমোহিত করে। ক্যাম্পে পৌঁছে সেনাবাহিনী পরিচালিত মিষ্টির দোকানে ঢুঁ মারা হয়, যা বেশ মজাদার ছিল।
ফেরার পথে আদিবাসী বাজারে হানা দেওয়া হয়। সেখানে পাহাড়ি কলা, তেঁতুল ও চাকমা দোকানদারের তৈরি পাটিসাপটা কেনা হয়। ভোজনরসিক বন্ধু রাসেলের উদ্যোগে গরম শিঙাড়াও খাওয়া হয়। কিছু সময় আদিবাসী গ্রাম ঘুরে দেখা হয়, যেখানে চাকমা মেয়েদের হস্তশিল্পের কাজ পর্যবেক্ষণ করা হয়। বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার আগে ঘাটে ফিরে দুপুরের খাবার সেরে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতের দিকে রওনা হয় দলটি।
পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে রাতের অভিজ্ঞতা
কাপ্তাই হ্রদে সময় বেশি ব্যয় হওয়ায় পতেঙ্গায় পৌঁছতে দেরি হয়, ফলে সূর্যাস্ত দেখা সম্ভব হয়নি। রাতের বেলা সমুদ্রসৈকতে প্রবেশ করার সময় সারি সারি দোকানে সামুদ্রিক বস্তু দিয়ে তৈরি গয়না ও খাবারের সমাহার নজর কাড়ে। কনকনে শীতে সমুদ্রপাড়ের মানুষদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন ভ্রমণকারীরা। উপকূলে নোঙর করা স্টিমার ও জাহাজ, আর মাঝে মাঝে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের দৃশ্য মোহনীয় ছিল।
তীরে হাঁটা, ঝালমুড়ি খাওয়া ও জোয়ার দেখার অপেক্ষায় সময় কাটে। রাত ৯টার পর জোয়ার শুরু হলে সবাই অভিভূত হন। সমুদ্রের পানি ছুঁয়ে দেখার অভিজ্ঞতা অমূল্য মনে হয়। শীতের তীব্রতা বাড়তে থাকায় দ্রুত ঢাকায় ফেরার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠেন সবাই। ফাঁকা রাস্তায় বাস দ্রুতবেগে ছুটে কুমিল্লায় রাতের খাবার সেরে ভোর ছয়টায় ঢাকায় পৌঁছান।
ভ্রমণ পরামর্শ ও সতর্কতা
পরিবহন: ঢাকা থেকে ট্রেন বা বাসযোগে চট্টগ্রাম পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে যাওয়া যায়। তবে ট্যুর দলে লোকসংখ্যা কম ও বাজেট সীমিত হলে বাস রিজার্ভ না করাই ভালো, কারণ এতে খরচ বেশি পড়তে পারে।
কেনাকাটা: সমুদ্রসৈকত পাড়ের দোকানগুলোতে অনেক সময় দেশীয় পণ্য বিদেশি বলে চালিয়ে দেওয়া হয়, তাই কেনাকাটায় সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
সুরক্ষা: কাপ্তাই হ্রদের চারপাশের স্থল অংশে বিষাক্ত সাপের উপদ্রব থাকতে পারে, তাই সাবধানতা জরুরি।
সময় ব্যবস্থাপনা: একাধিক গন্তব্য সহজে উপভোগ করতে হলে সময় ব্যবস্থাপনায় মনোযোগী হতে হবে, যাতে প্রতিটি স্থানে পর্যাপ্ত সময় বরাদ্দ করা যায়।
এই ভ্রমণ অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন একজন গবেষণা সহযোগী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী, যিনি বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির সাথে যুক্ত আছেন। ভ্রমণ থেকে পাওয়া স্মৃতি ও শিক্ষা জীবনকে সমৃদ্ধ করেছে বলে তিনি মনে করেন।
